দীর্ঘ দুই দশকের টানাপড়েন আর কূটনৈতিক শীতলতা কাটিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন ভোরের সূচনা হয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২০৯টি আসনে নিরঙ্কুশ জয় পেয়ে ভূমিধস বিজয় অর্জন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। এই ঐতিহাসিক জয়ের পর দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে উষ্ণ অভিনন্দন জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা দিল্লির এই অভাবনীয় তৎপরতাকে একটি বড় ধরনের ‘ডিপ্লোম্যাটিক ইউ-টার্ন’ বা কূটনৈতিক মোড় হিসেবে অভিহিত করছেন।
শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) সকালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর অফিসিয়াল ‘এক্স হ্যান্ডল’ (সাবেক টুইটার) থেকে তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়ে একটি বার্তা দেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, "এই জয় প্রমাণ করেছে যে বাংলাদেশের আপামর জনতা আপনার নেতৃত্বের ওপর আস্থা রেখেছে।" চমকপ্রদ বিষয় হলো, বার্তাটি ইংরেজি ছাড়াও সরাসরি বাংলা ভাষাতেও পোস্ট করা হয়, যাতে বাংলাদেশের তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের কাছে এই সৌহার্দ্যপূর্ণ বার্তা স্পষ্ট হয়। এর কিছুক্ষণ পরই প্রধানমন্ত্রী মোদী সরাসরি টেলিফোনে তারেক রহমানের সাথে কথা বলেন এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা করেন।
অতীতের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভারতের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে দীর্ঘকাল তারেক রহমানের প্রতি এক ধরনের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। ২০১৪ সালে মোদী সরকার ক্ষমতায় আসার পর তারেক রহমান লন্ডন থেকে শুভেচ্ছা উপহার ও ‘ফিলার’ পাঠিয়ে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করলেও তখন দিল্লির পক্ষ থেকে কোনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং বর্তমান নির্বাচনী ফলাফল দিল্লির সেই পুরোনো ‘পারসেপশন’ বা ধারণাকে আমূল বদলে দিয়েছে।
ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পিনাকরঞ্জন চক্রবর্তী এই পরিবর্তনকে বর্তমান বাস্তবতার নিরিখে ‘অটোমেটিক চয়েস’ হিসেবে দেখছেন। তিনি বিবিসিকে জানান, "বিগত ১৭ বছর যুক্তরাজ্যে থাকাকালীন তারেক রহমানের মানসিকতায় কতটা পরিবর্তন এসেছে তা দেখার বিষয়। তবে ভারত যে এখন তাঁর প্রতি ‘ওপেন আউটরিচ’ করছে, তাতে বোঝা যায় দুই পক্ষই কিছু নির্দিষ্ট ‘কমিটমেন্ট’ বা প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে এগিয়ে যাচ্ছে।" বিশেষ করে তারেক রহমানের সাম্প্রতিক ভাষণগুলোতে ভারতের প্রতি কট্টর আক্রমণের অভাব এবং ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিকে দিল্লি ইতিবাচক হিসেবে গ্রহণ করেছে।
দিল্লির ‘মনোহর পারিক্কর আইডিএসএ’-র সিনিয়র ফেলো স্ম্রুতি পট্টনায়কের মতে, শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের ইস্যুটি নিয়ে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার যতটা কঠোর ছিল, তারেক রহমানের পরবর্তী সরকার হয়তো কূটনৈতিক স্বার্থে সেখানে কিছুটা নমনীয়তা দেখাতে পারে। তবে সম্পর্কের এই মধুচন্দ্রিমার মাঝেও ‘সংখ্যালঘু সুরক্ষা’র বিষয়টি ভারতের কাছে বড় এক উদ্বেগের জায়গা। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এবং পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির প্রধান মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর নির্যাতন বন্ধ না হলে সম্পর্ক পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়া কঠিন হবে।
সার্বিকভাবে, দীর্ঘ সতেরো বছরের প্রবাস জীবন এবং চড়াই-উতরাই পেরিয়ে তারেক রহমান এখন বাংলাদেশের ক্ষমতার মসনদে সমাসীন হতে যাচ্ছেন। দিল্লির এই ‘রেড কার্পেট’ অভ্যর্থনা এবং প্রথাগত শীতলতা ভেঙে এগিয়ে আসা প্রমাণ করে যে, দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে বিএনপি এবং তারেক রহমানকে ছাড়া ভারতের আর কোনো বিকল্প নেই। এখন দেখার বিষয়, অতীতের সব তিক্ততা ধুয়ে মুছে দুই দেশ কীভাবে একটি স্থিতিশীল ও ভারসাম্যপূর্ণ অংশীদারত্ব গড়ে তোলে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।