পর্দায় তিনি ‘অ্যাংরি ইয়ং ম্যান’ হিসেবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠেন, কিন্তু বাস্তবের রাজনীতির মারপ্যাঁচে তিনি নিজেকে একসময় অত্যন্ত অসহায় আবিষ্কার করেছিলেন। ১৯৮০-র দশকের মাঝামাঝি সময়ে অমিতাভ বচ্চন যখন অভিনয় ছেড়ে রাজনীতিতে পা রাখেন, তখন ভারতজুড়ে তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল আকাশচুম্বী। কিন্তু মাত্র দুই বছরের মাথায় তীব্র বিতর্ক, কাদা-ছোড়াছুড়ি আর প্রবল মানসিক বিপর্যয় নিয়ে তাঁকে সেই জগত থেকে প্রস্থান করতে হয়।
পপুলারিটির শিখর থেকে রাজনীতির ময়দানে
১৯৮২ সালে ‘কুলি’ ছবির শুটিং সেটে ভয়াবহ দুর্ঘটনায় অমিতাভ যখন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে, তখন পুরো ভারত যেন থমকে গিয়েছিল। হাসপাতালের বাইরে ভক্তদের সেই নজিরবিহীন ভিড় প্রমাণ করেছিল, তিনি কেবল একজন অভিনেতা নন, বরং ভারতের জাতীয় আবেগের প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। ঠিক এর দুই বছর পর, ১৯৮৪ সালে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকাণ্ডের পর ভারতের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে যায়। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন রাজীব গান্ধী। রাজীব ছিলেন অমিতাভের শৈশবের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। বন্ধুর আহ্বানে এবং তৎকালীন ‘ইমোশনাল’ আবহে অমিতাভ নাম লেখান কংগ্রেসে।
এলাহাবাদের ঐতিহাসিক ভোটযুদ্ধ
১৯৮৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে উত্তর প্রদেশের এলাহাবাদ কেন্দ্র থেকে প্রার্থী হন অমিতাভ। তাঁর বিপরীতে ছিলেন ঝানু রাজনীতিবিদ হেমবতী নন্দন বাহুগুনা। কিন্তু অমিতাভের জনপ্রিয়তার ঝড়ে খড়কুটোর মতো উড়ে যান অভিজ্ঞ এই রাজনীতিক। রেকর্ড ব্যবধানে জয়ী হয়ে সংসদে পা রাখেন বিগ বি। সেই বিজয় অনেক প্রবীণ রাজনৈতিক নেতার জন্য ছিল চরম অস্বস্তিকর।
দিল্লির করিডোরে ‘বহিরাগত’ ও চক্রান্তের শিকার
সাংসদ হওয়ার পর অমিতাভ নিজের এলাকা এলাহাবাদের উন্নয়ন নিয়ে বেশ সক্রিয় ছিলেন। কিন্তু দিল্লির ক্যাবিনেট আর লবিংয়ের রাজনীতিতে তিনি ছিলেন একজন ‘বহিরাগত’। প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি ঘনিষ্ঠ হওয়ায় দলের ভেতর থেকেই অনেকে তাঁকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখতে শুরু করেন। জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক বীর সাংঘি তাঁর স্মৃতিকথায় উল্লেখ করেছিলেন, কংগ্রেসের অনেক শীর্ষ নেতা অমিতাভকে ক্ষমতার জন্য হুমকি মনে করতেন। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, তিনি এলাহাবাদে কয়েক দিন না গেলেই শহরে তাঁর নামে ‘নিখোঁজ’ পোস্টার লাগিয়ে দেওয়া হতো। অমিতাভ বুঝতে শুরু করেছিলেন, চলচ্চিত্রের ‘ডেডলাইন’ আর রাজনীতির ‘স্ট্র্যাটেজি’—দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন মেরুর বিষয়।
বফর্স কেলেঙ্কারি ও ‘নরক’ অভিজ্ঞতা
১৯৮৭ সালে ভারতীয় রাজনীতিতে উল্কাপাতের মতো হানা দেয় ‘বফর্স কেলেঙ্কারি’। সুইডিশ কোম্পানির সাথে কামান চুক্তিতে দুর্নীতির অভিযোগে জড়িয়ে যায় অমিতাভ ও তাঁর ভাই অজিতাভ বচ্চনের নাম। যদিও সরাসরি কোনো প্রমাণ ছিল না, তবুও সংবাদমাধ্যম এবং সংসদে তাঁকে নিয়ে যে ধরনের কুরুচিপূর্ণ আক্রমণ শুরু হয়, তাতে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। পরবর্তীতে সিমি গাড়োয়ালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সেই সময়টিকে ‘নরক’ হিসেবে বর্ণনা করেন তিনি। অমিতাভ বলেছিলেন, “আমি আক্রমণের প্রকৃতি বুঝতে পারিনি। এটি চলচ্চিত্রের গসিপের মতো ছিল না, এটি ছিল অনেক বেশি ব্যক্তিগত ও নিষ্ঠুর।”
নির্দোষ প্রমাণ ও চূড়ান্ত বিচ্ছেদ
অবশেষে মাত্র দুই বছরের মাথায় সাংসদ পদ থেকে ইস্তফা দেন তিনি। দীর্ঘ সময় পর ২০১২ সালে আদালত তাঁকে নির্দোষ ঘোষণা করলেও সেই আঘাতের দাগ মুছতে তাঁর অনেক সময় লেগেছে। অমিতাভ পরে জানিয়েছিলেন, সরকারি ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা তাঁকে হতাশ করেছিল। সরাসরি মানুষের কাজ করতে গিয়েও যেখানে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য খোঁজা হয়, সেখানে থাকা তাঁর জন্য অসম্ভব ছিল।
রাজনীতির সেই বিষাক্ত অধ্যায় পেছনে ফেলে অমিতাভ পুনরায় ফিরে এসেছিলেন রুপালি পর্দায়। নব্বইয়ের দশকের আর্থিক সংকট আর ক্যারিয়ারের পতন সামলে ‘কৌন বনেগা ক্রৌড়পতি’র মাধ্যমে নিজেকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। বর্তমান প্রজন্মের কাছে তিনি এক পরম শ্রদ্ধেয় কিংবদন্তি হলেও, রাজনীতিতে তাঁর সেই সংক্ষিপ্ত অধ্যায়টি আজও ভারতের ক্ষমতা ও গ্ল্যামারের ইতিহাসের এক অমীমাংসিত ‘ট্র্যাজেডি’ হিসেবে বিবেচিত হয়।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।