ঋতুচক্রের চিরচেনা আবর্তনে বর্ষার সজল বিদায় ঘটিয়ে আজ রবিবার (১৬ আগস্ট) থেকে যাত্রা শুরু করেছে শুভ্র শরতের প্রথম মাস ভাদ্র। পঞ্জিকার হিসেবে গতকাল শনিবার ছিল বর্ষার শেষ দিন। নিয়ম অনুযায়ী, এ সময়ে আকাশে ধবধবে সাদা মেঘের ভেলা আর প্রকৃতিতে বৃষ্টির শীতল পরশ থাকার কথা থাকলেও, এবার বাস্তবচিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। বৃষ্টির চিরচেনা স্নিগ্ধতাকে ছাপিয়ে এক রুক্ষ ও তপ্ত আবহাওয়ার কবলে পড়েছে প্রাণ-প্রকৃতি। বিশেষ করে রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে বইছে তীব্র দাবদাহ, যা জনজীবনকে করে তুলেছে ওষ্ঠাগত।
আবহাওয়ার উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে। আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, সাধারণত পুরো আগস্ট মাসে দেশে সাড়ে ৩০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হওয়ার কথা। কিন্তু চলতি মাসের প্রথম দুই সপ্তাহে বৃষ্টির দেখা মিলেছে ১০০ মিলিমিটারের কম; যার পরিমাণ মাত্র ৯০ মিলিমিটারের কাছাকাছি। বৃষ্টির এই বিশাল ঘাটতির কারণে উত্তরের জনপদ এখন তপ্ত মরুভূমির মতো উত্তাপ ছড়াচ্ছে। আকাশ থেকে বৃষ্টির বদলে নামছে আগুনের হল্কা।
পরিসংখ্যান বলছে, গত কয়েক বছরে আগস্ট মাসে এই অঞ্চলের গড় তাপমাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। রংপুর আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত আগস্টের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ২১ থেকে ২৩ ডিগ্রি এবং সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩০ থেকে ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে। অথচ গত তিন বছরে তা ৩ থেকে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে গিয়ে এখন ৩৫ থেকে ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে দাঁড়িয়েছে। শনিবার দুপুর ৩টার তথ্যানুযায়ী, রংপুরে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৫.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এছাড়া সৈয়দপুরে ৩৬.২ ডিগ্রি, ডিমলায় ৩৫.৫ ডিগ্রি, দিনাজপুরে ৩৫.৫ ডিগ্রি, কুড়িগ্রামের রাজারহাটে ৩৫.৫ ডিগ্রি এবং দেশের সর্বউত্তরের জেলা তেঁতুলিয়ায় তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৬.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আবহাওয়া বিজ্ঞানের ভাষায়, তাপমাত্রা ৩৬ ডিগ্রি ছাড়িয়ে গেলেই তাকে ‘মৃদু তাপপ্রবাহ’ বলা হয়। সেই হিসেবে বর্তমানে পঞ্চগড় ও নীলফামারী জেলার ওপর দিয়ে মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা প্রকৃতির এই বৈরী আচরণের পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের (Climate Change) অশুভ ছায়াকে দায়ী করছেন। উত্তরাঞ্চলের নদ-নদীতে আশঙ্কাজনক হারে পানি কমে যাওয়া এবং বৃষ্টিবলয় এই অঞ্চল থেকে দূরে সরে যাওয়াই এর প্রধান কারণ। এছাড়া যত্রতত্র শিল্পকারখানার বর্জ্য, হোটেল-রেস্তোরাঁর আবর্জনা এবং কসাইখানার বর্জ্য ফেলে রাখার ফলে যে পরিবেশ দূষণ ঘটছে, তা বাতাসের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করছে। বিষাক্ত বর্জ্য পচে বাতাসে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে এবং সামগ্রিক উষ্ণতা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এই অস্বাভাবিক তাপমাত্রার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে। বিশেষজ্ঞরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, তাপমাত্রার এই ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত থাকলে এ অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য থেকে অনেক বিরল প্রজাতি হারিয়ে যেতে পারে এবং উত্তরাঞ্চল দ্রুত মরুকরণের দিকে ধাবিত হবে। এদিকে অসহ্য গরমের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তীব্র বিদ্যুতের লোডশেডিং। চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকায় ভোগান্তি এখন চরমে। বাসাবাড়ি থেকে শুরু করে হাসপাতাল—সবখানেই রোগীরা গরমে ছটফট করছেন।
রংপুর আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ মোস্তাফিজার রহমান জানান, এ বছর আগস্ট মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। মেঘের বলয় দূরে থাকা এবং পরিবেশ দূষণের কারণে বায়ুমণ্ডলে উষ্ণতা বাড়ছে। যা দীর্ঘমেয়াদে এই অঞ্চলের প্রকৃতির জন্য এক অশনিসঙ্কেত।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।