যানজটের ঢাকায় বিলাসবহুল যাতায়াত: একযোগে নামছে ৬৯০টি এসি বাস, কোন রুটে চলবে কার গাড়ি?

রাজধানী ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থায় আধুনিকায়ন ও যাত্রীদের ভোগান্তি কমাতে এক বড় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে ঢাকা মেট্রো যাত্রী ও পণ্য পরিবহন কমিটি। ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম রুটে চলাচলের জন্য আটটি কোম্পানিকে মোট ৬৯০টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (এসি) বাস নামানোর চূড়ান্ত অনুমোদন বা ‘রুট পারমিট’ প্রদান করা হয়েছে। মূলত যানজটজর্জরিত এই শহরে সাধারণ মানুষের যাতায়াতকে আরও আরামদায়ক, নিরাপদ এবং সময়সাশ্রয়ী করার লক্ষ্যেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।


ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কমিটির সর্বশেষ সভায় এই বিশাল সংখ্যক এসি বাসের আবেদন মঞ্জুর করা হয়। অনুমোদিত কোম্পানিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাস নামানোর সুযোগ পেয়েছে ‘শাপলা পরিবহন’; তারা চন্দ্রা থেকে ধোলাইখাল রুটে ২০০টি এসি বাস পরিচালনা করবে। এছাড়া ‘চিত্রা পরিবহন লিমিটেড’ ১২০টি এবং ‘টাইম বার্ড এক্সপ্রেস’ ১০০টি বাসের অনুমতি পেয়েছে। ‘স্প্রিন্ট শ্যাটল প্রাইভেট লিমিটেড’ দুটি ভিন্ন রুটে মোট ১০০টি বাস নামানোর সবুজ সংকেত লাভ করেছে। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ‘ইকবাল এন্টারপ্রাইজ’ ও ‘নিউ ঢাকা পরিবহন’ ৫০টি করে, ‘ট্রাস্ট ট্রান্সপোর্ট সার্ভিসেস’ ৪০টি এবং ‘ঢাকা ট্রান্সপোর্ট লাইন’ ৩০টি আধুনিক এসি বাস চলাচলের অনুমতি পেয়েছে।


রুটগুলোর বিন্যাসেও দেখা গেছে ব্যাপক বৈচিত্র্য। সাভারের নন্দনপার্ক থেকে মদনপুর, বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল থেকে পঞ্চবটী, কিংবা কমলাপুর থেকে নারায়ণগঞ্জের বন্দর—সবগুলো রুটে এই বাসগুলো চলাচল করবে। তবে শুধু অনুমতি দিলেই হবে না, যাতায়াত ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরাতে কমিটি কিছু কঠোর শর্তারোপ করেছে। প্রতিটি বাসে বাধ্যতামূলকভাবে ‘অটো-ডোর’ এবং ‘ই-টিকেটিং’ ব্যবস্থা থাকতে হবে। দীর্ঘদিনের বিশৃঙ্খল ‘কন্ট্রাক্ট সিস্টেম’ পুরোপুরি বাতিল করে কাউন্টারভিত্তিক সেবা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া যাত্রী বিভ্রান্তি এড়াতে একই কোম্পানির সব বাসের রঙ অভিন্ন হতে হবে এবং বাসের বডিতে রুট নম্বর ও কোম্পানির নাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে।


তবে এই নতুন উদ্যোগ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলম বলেন, এসি বাস বাড়লে ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর চাপ কমবে, তবে এসি বাসের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ও যৌক্তিক ভাড়া কাঠামো দ্রুত নির্ধারণ করা প্রয়োজন। অন্যদিকে, পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক ড. সামছুল হক এই প্রক্রিয়াকে আরও বিজ্ঞানভিত্তিকভাবে পরিচালনার তাগিদ দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, কেবল বাসের সংখ্যা বাড়ানোই সমাধান নয়, বরং যাত্রী চাহিদা নিরূপণ ও স্টপেজ নির্ধারণের জন্য পেশাদার ‘ম্যাস ট্রান্সপোর্টেশন ইউনিট’ গঠন করা জরুরি।


উল্লেখ্য, ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) তথ্যানুযায়ী বর্তমানে ঢাকার ১২৮টি রুটে ৭ হাজারেরও বেশি বাস নিবন্ধিত থাকলেও বাস্তবে অর্ধেকেরও কম বাস রাস্তায় চলাচল করছে। বহু রুটে অবৈধ বা পারমিটহীন বাস চলাচলের কারণে বিশৃঙ্খলা লেগেই থাকে। এই পরিস্থিতিতে ৬৯০টি নতুন এসি বাস ঢাকার গণপরিবহনের দৃশ্যপট কতটা বদলাতে পারে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।


ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।