বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বিরল অধ্যায়ের জন্ম দিয়ে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজের অবস্থান পরিবর্তনের এক অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে তিনটি ভিন্ন প্রকৃতির সরকারের অধীনে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনকালে প্রত্যেক সরকারেরই প্রশংসা করে তাঁর দেওয়া ভাষণ এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
একসময় যে রাষ্ট্রপতিকে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার মনোনীত করেছিল, আজ তিনিই সেই সরকারের শাসনকালকে ‘ফ্যাসিবাদী’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে দেওয়া তাঁরล่าสุด ভাষণটি দেশের চলমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এক নতুন বিতর্কের সূচনা করেছে। ভাষণে তিনি জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে উল্লেখ করেন এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে বেগম খালেদা জিয়ার আপসহীন নেতৃত্বের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
রাষ্ট্রপতি তাঁর ভাষণে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলেন, "তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের মাধ্যমে হাজারো শহীদের রক্তের বিনিময়ে দেশে নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের সূচনা হয়েছে।" দেড় দশকের শাসনামলে সংঘটিত গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে চালানো নির্যাতন-নিপীড়নের কথাও তিনি তাঁর বক্তব্যে তুলে ধরেন। রাষ্ট্রপতি যখন ফ্যাসিবাদী শাসনের সমালোচনা করছিলেন, তখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ বিএনপির সংসদ সদস্যরা টেবিল চাপড়ে তাঁকে জোরালো সমর্থন জানান। তবে এই ভাষণের প্রতিবাদে জামায়াতে ইসলামী ও জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী ছাত্রদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে।
রাষ্ট্রপতির এই বর্তমান অবস্থানের সঙ্গে মাত্র দুই বছর আগের তাঁর বক্তব্যের রয়েছে আকাশ-পাতাল ফারাক। ২০২৪ সালের ৩০ জানুয়ারি তৎকালীন দ্বাদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন। সে সময় তিনি ৭ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জনকারী দলগুলোর, বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াতের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেছিলেন যে, একটি মহল সহিংসতা সৃষ্টির মাধ্যমে দেশের গণতান্ত্রিক যাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করার অপচেষ্টা চালিয়েছে। সেই বিতর্কিত নির্বাচনকে তিনি ‘জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে সফল’ বলে অভিহিত করেছিলেন এবং তাঁর ভাষণ শেষ করেছিলেন ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে। অথচ এবার তিনি ভাষণ সমাপ্ত করেন ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ বলে।
রাষ্ট্রপতির ভাষণের এই নাটকীয় পরিবর্তন নিয়ে বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয়েছে, কারণ সাংবিধানিকভাবে এই ভাষণটি সাধারণত সরকার বা মন্ত্রিসভা কর্তৃক প্রস্তুত করা হয় এবং রাষ্ট্রপতি কেবল তা পাঠ করেন। কিন্তু যে রাজনৈতিক বাস্তবতায় এবারের সংসদ গঠিত হয়েছে, তা সম্পূর্ণ ভিন্ন। সংসদ নেতা তারেক রহমান যেখানে সংসদকে সকল রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু করার ঘোষণা দিয়েছেন, সেখানে প্রশ্ন উঠছে—রাষ্ট্রপতির এই ভাষণ কি কেবলই সরকারের লেখা বয়ান, নাকি এতে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদাধিকারীর নিজস্ব অবস্থানও প্রতিফলিত হয়েছে?
মো. সাহাবুদ্দিনের রাষ্ট্রপতি হওয়া শুরু থেকেই ছিল আলোচনা-সমালোচনায় মুখর। ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল তিনি দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। তাঁর অতীত রাজনৈতিক ও পেশাগত কর্মকাণ্ড, বিশেষ করে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার এবং এস আলম গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হিসেবে তাঁর ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন ছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এস আলম-সংশ্লিষ্ট জেএমসি বিল্ডার্সের শেয়ার বাংলাদেশ ব্যাংক জব্দ করেছে, যে প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি ইসলামী ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন।
বর্তমান বিএনপি সরকার সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার স্বার্থে তাঁকে স্বপদে বহাল রাখলেও, তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন রয়েই গেছে। সংসদ বসার আগেই এনসিপি তাঁর অভিশংসনের দাবি তুলেছিল। গতকাল সংসদে এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, "কোনো ফ্যাসিস্ট বা তাঁর দোসর যেন বক্তব্য দিয়ে সংসদকে কলুষিত করতে না পারেন।"
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান রাষ্ট্রপতিকে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ ও ‘খুনির দোসর’ আখ্যা দিয়ে তাঁর পূর্বের বক্তব্যের অসঙ্গতি তুলে ধরেছেন। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে ভিন্নমতও রয়েছে। গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব আব্দুন নূর তুষার রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের কাছে নাহিদ ইসলামদের উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেওয়ার ছবি পোস্ট করে লিখেছেন, "উপদেষ্টা হবার কালে-দোসর ভালো লাগে-এখন লাগে না।"
রাষ্ট্রপতির ভাষণ সংসদের আনুষ্ঠানিক সূচনা হলেও, এবারের ভাষণটি এক তীব্র রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, যা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদের ভাবমূর্তি এবং মহান জাতীয় সংসদের মর্যাদা নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।