হলিউডের কিংবদন্তি নির্মাতা স্টিভেন স্পিলবার্গের নতুন সিনেমা ‘ডিসক্লোজার ডে’ মুক্তি পেয়েছে এমন এক মাহেন্দ্রক্ষণে, যখন মার্কিন রাজনীতিতেও ভিনগ্রহের প্রাণী বা ‘ইউএফও’ নিয়ে চলছে ব্যাপক তোলপাড়। কাকতালীয়ভাবে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন সম্প্রতি ‘ইউএপি’ (UAP) বা আনআইডেন্টিফাইড অ্যানোমালাস ফেনোমেনা সংক্রান্ত বহু গোপন ফাইল প্রকাশ করেছে। বাস্তবের এই নথিপত্র ফাঁসের আবহে স্পিলবার্গের নতুন সিনেমাটি যেন আধুনিক সময়ের এক বিদ্রোহী দলিল হয়ে উঠেছে, যেখানে মার্কিন সরকারের কাছে থাকা ভিনগ্রহের প্রাণীর অস্তিত্ব গোপনের ষড়যন্ত্রকে চ্যালেঞ্জ জানানো হয়েছে।
সিনেমাটির গল্প শুরু হয় ড্যানিয়েল কেলনারকে (জশ ও’কনর) ঘিরে, যাকে হন্যে হয়ে তাড়া করছে ‘ওয়ারডেক্স’ নামের এক রহস্যময় গোপন সংস্থা। এই সংস্থার প্রধান কৌশলী নোয়া স্ক্যানলন (কলিন ফার্থ) ড্যানিয়েলের প্রেমিকা জেনকে (ইভ হিউসন) জিম্মি করে এমন একটি বস্তু ফেরত চান, যা ড্যানিয়েল তাদের কাছ থেকে চুরি করেছে। চিত্রনাট্যকার ডেভিড কোপ এখানে চেনা সায়েন্স ফিকশন আর ‘চেজ থ্রিলার’-এর এক দুর্দান্ত মিশেল ঘটিয়েছেন। স্পিলবার্গ এখানে এলিয়েনের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের চিরাচরিত প্রথা ভেঙে আমাদের সরাসরি নিয়ে যান এমন এক পৃথিবীতে, যেখানে সত্য প্রকাশের জন্য লড়াই করছে একদল বিদ্রোহী।
সিনেমার কাহিনী নতুন মোড় নেয় কানসাস সিটির আবহাওয়া উপস্থাপক মার্গারেট ফেয়ারচাইল্ডকে (এমিলি ব্লান্ট) ঘিরে। হঠাৎ করেই অবিশ্বাস্য সব ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠেন তিনি; অচেনা মানুষের চোখের দিকে তাকিয়ে তাদের অতীত পড়ে ফেলেন, এমনকি সাবলীলভাবে বলতে শুরু করেন অবোধ্য কোনো ভিনগ্রহের ভাষা। প্রেমিকের (ওয়ায়াট রাসেল) সঙ্গে তাঁর এই অতিপ্রাকৃত রূপান্তরের দৃশ্যগুলো দর্শকদের শিহরিত করে। পুরো সিনেমাটি মূলত ড্যানিয়েল, মার্গারেট, হুগো ওয়েকফিল্ড (কোলম্যান ডোমিঙ্গো) এবং নোয়ার সমান্তরাল চারটি গল্পের ওপর ভিত্তি করে এগোয়, যা শেষ পর্যন্ত এক চূড়ান্ত সংকেত বা ‘ডিসক্লোজার ডে’-তে গিয়ে মিলে যায়।
প্রযুক্তিগত দিক থেকে স্পিলবার্গ আবারও প্রমাণ করেছেন কেন তিনি সেরাদের সেরা। দীর্ঘদিনের সহযোগী এবং ‘শিন্ডলার্স লিস্ট’ খ্যাত অস্কারজয়ী চিত্রগ্রাহক ইয়ানুশ কামিনস্কির চঞ্চল ক্যামেরা অ্যাকশন দৃশ্যগুলোতে এক অস্থির কিন্তু প্রাণবন্ত অনুভূতি দিয়েছে। বিশেষ করে একটি খামারবাড়ির দিকে ড্যানিয়েলের এগিয়ে যাওয়ার দৃশ্য কিংবা গাড়ি ও ট্রেনের সংঘর্ষের সিকোয়েন্সগুলো দর্শকদের শ্বাসরুদ্ধ করে রাখে। এর সাথে জন উইলিয়ামসের অনবদ্য আবহসংগীত রোমাঞ্চকে নিয়ে গেছে অন্য উচ্চতায়। অভিনয়ে এমিলি ব্লান্টের অস্থিরতা ও জশ ও’কনরের অনিশ্চয়তা চরিত্রগুলোকে রক্ত-মাংসের মানুষ হিসেবে ফুটিয়ে তুলেছে।
তবে সমালোচকদের মতে, ১৯৭৭ সালের ‘ক্লোজ এনকাউন্টারস অব দ্য থার্ড কাইন্ড’ সিনেমা দিয়ে স্পিলবার্গ যে বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছিলেন, আধুনিক যুগের ‘ডিসক্লোজার ডে’ সেখানে কিছুটা পিছিয়ে। বর্তমান পৃথিবীতে ‘ইউটিউব’ বা ইন্টারনেটে অপেশাদার ইউএফও ফুটেজ এত সহজলভ্য যে, পর্দায় নতুন কিছু উদ্ভাবন করা স্পিলবার্গের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। সিনেমার শেষ এক ঘণ্টা কিছুটা কুয়াশাচ্ছন্ন এবং অনেক অমীমাংসিত প্রশ্নের জন্ম দেয়—যেমন কোরিয়া থেকে আসা হুমকি বা সেই বিশেষ ধাতব যন্ত্রটির কার্যকারিতা। পুরনো সেই ব্লকবাস্টারের ‘নস্টালজিয়া’ থাকলেও ‘ডিসক্লোজার ডে’ হয়তো স্পিলবার্গের চিরস্মরণীয় কাজগুলোর তালিকায় শেষ পর্যন্ত জায়গা পাবে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক থেকেই যাচ্ছে। তবে সায়েন্স ফিকশন প্রেমীদের জন্য এটি যে এক উপভোগ্য অভিজ্ঞতা, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।