ভারতীয় সংগীতের ইতিহাসে আশা ভোঁসলে কেবল একটি নাম নয়, বরং একটি সুদীর্ঘ প্রতিষ্ঠানের নাম। সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে সহস্রাধিক কালজয়ী গানের মাধ্যমে তিনি কয়েক প্রজন্মের অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছিলেন। তবে রূপালি পর্দার ঝলমলে আলোর আড়ালে জীবনের প্রতিটি বাঁকে তাঁকে লড়তে হয়েছে একাকী। বিশেষ করে তাঁর প্রথম দাম্পত্য জীবনের সেই ভয়ংকর স্মৃতিগুলো আজও সংগীতপ্রেমীদের হৃদয়ে শিহরণ জাগায়।
ভারতীয় গণমাধ্যম ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, মাত্র ১৬ বছর বয়সে প্রেমের টানে নিজের চেয়ে ২০ বছরের বড় গণপতরাও ভোঁসলেকে বিয়ে করার হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আশা। তাঁর এই একগুঁয়ে জেদ মঙ্গেশকর পরিবারে বড় ধরনের ফাটল ধরিয়েছিল। আশা নিজেই এক সাক্ষাৎকারে স্মৃতিচারণ করে বলেছিলেন, “ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম বলেই লতা দিদি আমার ওপর প্রচণ্ড রেগে গিয়েছিলেন এবং দীর্ঘ সময় আমার সাথে কোনো কথা বলেননি। দিদি সেই বিয়ে কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি।”
কিন্তু যে স্বপ্নের টানে ঘর ছেড়েছিলেন, সেখানে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল বিভীষিকা। রক্ষণশীল শ্বশুরবাড়িতে একজন গায়িকা পুত্রবধূকে কেউ বরণ করে নেয়নি। উল্টো তাঁর ওপর শুরু হয় অসহনীয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। তাঁর স্বামী গণপতরাও চাইতেন না যে বড় বোন লতার সাথে আশার কোনো যোগাযোগ থাকুক। সেই নির্যাতনের মাত্রা চরমে ওঠে যখন আশা তাঁর তৃতীয় সন্তান আনন্দের জন্ম দিতে চলেছেন। সেই দিনগুলোর কথা মনে করে শিল্পী বলেছিলেন, “সেখানে প্রতিদিন অমানবিক অত্যাচার চলত। অবশেষে আমার ছোট ছেলে আনন্দের জন্মের ঠিক আগমুহূর্তে আমাকে সেই ঘর থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল।”
এমন চরম অসহায়ত্ব ও অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় সন্তানদের নিয়ে মায়ের কাছে ফিরে এসেছিলেন তিনি। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি কারও প্রতি কোনো ঘৃণা বা ক্ষোভ পোষণ করেননি। তিনি মনে করতেন, সেই বিয়ে না হলে তিনি তাঁর তিন সন্তানকে পেতেন না। পরবর্তীতে ১৯৮০ সালে বিখ্যাত সংগীত পরিচালক রাহুল দেব বর্মণের (আরডি বর্মণ) সঙ্গে তাঁর বিয়ে হলেও মনের গহীনে প্রথম জীবনের সেই ক্ষত আজীবন বয়ে বেড়িয়েছেন তিনি। রাহুল দেবের সঙ্গে তাঁর আধ্যাত্মিক ও সুরের মেলবন্ধন থাকলেও জীবনযাত্রার পার্থক্যের কারণে একপর্যায়ে তাঁরা আলাদা থাকতে শুরু করেন, যদিও পারস্পরিক শ্রদ্ধা ছিল অটুট।
দীর্ঘ সাত দশকের বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে আশা ভোঁসলে অসংখ্য সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। ভারতের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র সম্মান ‘দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার’ ছাড়াও তিনি অর্জন করেছেন ‘পদ্মবিভূষণ’। একাধিক জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও ফিল্মফেয়ারে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন অনন্য উচ্চতায়। তাঁর প্রয়াণে কেবল একটি কণ্ঠের নীরবতা ঘটেনি, বরং অবসান হলো এক দুর্জয় মানসিক শক্তির আধার ও এক অপরাজেয় যোদ্ধার মহাকাব্য। যে কণ্ঠ লক্ষ মানুষের বিরহ-বেদনার সঙ্গী হয়েছে, সেই কণ্ঠের মালিক আজ সকল জাগতিক যন্ত্রণার ওপারে চিরশান্তিতে শায়িত।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।