নাট্য সমালোচনা
লাইলী মজনু: প্রেম, লোকঐতিহ্য ও সমকালীন মঞ্চভাষার এক সৃজনশীল পুনর্নির্মাণ
তরু শাহরিয়ার স্বর্গ
নাটক কখনো কেবল একটি গল্পের মঞ্চরূপ নয়; এটি একটি সময়ের চিন্তা, একটি সমাজের সাংস্কৃতিক স্মৃতি এবং মানুষের অস্তিত্বগত প্রশ্নের শিল্পভাষা। সেই অর্থে লাইলী মজনু শুধু একটি কালজয়ী প্রেমকাহিনির পুনর্মঞ্চায়ন নয়, বরং প্রেম, ক্ষমতা, সামাজিক নিয়ন্ত্রণ এবং মানবিক স্বাধীনতার বহুমাত্রিক পাঠ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের তৃতীয় বর্ষ, ষষ্ঠ সেমিস্টারের শিক্ষার্থীদের পরিবেশনায় এবং তানভির নাহিদ খানের নির্দেশনায় এই প্রযোজনাটি এমন এক নাট্য-অভিজ্ঞতার জন্ম দিয়েছে, যেখানে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সংলাপ সমানভাবে সক্রিয়।
আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে সম্পর্কের স্থায়িত্ব ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। প্রযুক্তি মানুষের যোগাযোগকে সহজ করেছে, কিন্তু আবেগকে প্রায়শই ক্ষণস্থায়ী করে তুলেছে। এই বাস্তবতায় লাইলী মজনু আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে প্রেম কখনো কেবল ব্যক্তিগত অনুভূতি নয়; এটি প্রতিরোধের ভাষা, আত্মত্যাগের দর্শন এবং সামাজিক বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে মানুষের অন্তর্লৌকিক স্বাধীনতার ঘোষণা। ফলে নাটকটি মধ্যযুগীয় আখ্যানের সীমা অতিক্রম করে সমকালীন দর্শকের কাছেও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।
নির্দেশক তানভির নাহিদ খানের অন্যতম সাফল্য হলো, তিনি আখ্যানকে সরল বর্ণনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। বরং নাটকের ভেতরের আবেগ, প্রতীক এবং সাংস্কৃতিক স্তরগুলোকে নতুনভাবে বিন্যস্ত করেছেন। তাঁর নির্দেশনায় দৃশ্য থেকে দৃশ্যে যাত্রা কোনো যান্ত্রিক পরিবর্তন নয়; বরং একটি আবেগ থেকে আরেকটি আবেগে, একটি মানসিক অবস্থা থেকে আরেকটি অবস্থায় প্রবেশ। ফলে দর্শক কেবল ঘটনাপ্রবাহ অনুসরণ করেন না, বরং নাটকের অভ্যন্তরীণ অনুভূতির অংশ হয়ে ওঠেন।
এই প্রযোজনার মঞ্চব্যবহার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পরীক্ষণধর্মী হলের সীমিত পরিসরকে এমন দক্ষতায় ব্যবহার করা হয়েছে যে প্রতিটি কোণ নাট্যঘটনার সক্রিয় অংশে পরিণত হয়েছে। উঁচু-নিচু প্ল্যাটফর্ম, খোলা চলাচলের পথ এবং স্তরভিত্তিক অবস্থান চরিত্রগুলোর সামাজিক দূরত্ব, মানসিক একাকিত্ব এবং ক্ষমতার সম্পর্ককে দৃশ্যমান করেছে। মঞ্চ এখানে কেবল অভিনয়ের স্থান নয়; এটি নিজেই অর্থ উৎপাদনকারী একটি নন্দনতাত্ত্বিক উপাদান।
মঞ্চসজ্জায় সংযম ছিল এই প্রযোজনার আরেকটি শক্তি। অতিরিক্ত বাস্তবতার অনুকরণ না করে প্রতীকী নির্মাণের মাধ্যমে বহুমাত্রিক পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে। খুব অল্প উপকরণ দিয়ে কখনও মরুভূমি, কখনও কাফেলার পথ, কখনও অন্তর্জগতের নিঃসঙ্গতা নির্মিত হয়েছে। এই সংযম প্রমাণ করে, থিয়েটারের প্রকৃত শক্তি ব্যয়বহুল উপকরণে নয়; শিল্পভাবনা, বিন্যাস এবং কল্পনাশক্তিতেই তার সাফল্য নিহিত।
সংগীত এই প্রযোজনার প্রাণশক্তি। এখানে গান বা সুর কোনো অলংকার হিসেবে ব্যবহৃত হয়নি; বরং নাট্যবিন্যাসের মৌলিক কাঠামো নির্মাণে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। সংলাপ যেখানে থেমেছে, সেখানে সুর চরিত্রের নীরব অনুভূতিকে প্রকাশ করেছে। সমবেত কণ্ঠ, তাল এবং বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার নাটকের আবেগকে বহুগুণে সমৃদ্ধ করেছে। বিশেষ করে লোকসংগীতের উপাদান এবং মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সুরধারার সৃজনশীল সমন্বয় নাটকটিকে একটি স্বতন্ত্র সংগীতনাট্যের রূপ দিয়েছে।
কোরিওগ্রাফিও এই প্রযোজনার একটি শক্তিশালী ভাষা। দেহ এখানে কেবল অভিনয়ের বাহন নয়; এটি একটি চলমান চিহ্নতন্ত্র। দলগত শরীরের বিন্যাস কখনও মরুভূমির বিস্তার, কখনও প্রেমিকের নিঃসঙ্গতা, কখনও সমাজের সম্মিলিত চাপ, আবার কখনও মানবমনের অন্তর্দ্বন্দ্বকে দৃশ্যমান করেছে। প্রতিটি চলন এবং স্থিরতার মধ্যে একটি সুস্পষ্ট নাট্যচিন্তা কাজ করেছে। বিশেষভাবে সমবেত দৃশ্যগুলোর জ্যামিতিক বিন্যাস নাটকের দৃশ্যরূপকে নন্দনতাত্ত্বিক গভীরতা প্রদান করেছে।
আলোক পরিকল্পনায় ছিল প্রশংসনীয় সংযম ও সংবেদনশীলতা। আলোকে কেবল দৃশ্যমানতার জন্য ব্যবহার করা হয়নি; বরং আবেগের স্থাপত্য নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছে। কোথাও গাঢ় নীলের বিষণ্নতা, কোথাও উষ্ণ আলোর মানবিকতা, কোথাও আধো-আলোর রহস্যময়তা নাটকের আবহকে গভীর করেছে। আলো ও ছায়ার এই পারস্পরিক সম্পর্ক দর্শকের অনুভূতিকে পরিচালিত করেছে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে।
পোশাক ও রূপসজ্জায় ঐতিহাসিক অনুষঙ্গ বজায় রাখার পাশাপাশি স্থানীয় নন্দনতত্ত্বেরও উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়। চরিত্রগুলোর পোশাকে আরব্য ঐতিহ্যের ইঙ্গিত থাকলেও তা কখনো কৃত্রিম মনে হয়নি। বরং বাংলা নাট্যমঞ্চের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি বিশ্বাসযোগ্য দৃশ্যজগৎ নির্মিত হয়েছে।
অভিনয়ের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের আন্তরিকতা এবং শৃঙ্খলা বিশেষভাবে প্রশংসার দাবি রাখে। একক অভিনয়ের চেয়ে দলগত অভিনয়ের শক্তিই এখানে বেশি উজ্জ্বল। প্রত্যেক অভিনয়শিল্পী নিজেকে আলাদা করে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা না করে সমষ্টিগত দৃশ্যরচনায় অবদান রেখেছেন। সমকালীন থিয়েটারের ভাষায় যাকে Ensemble Performance বলা হয়, এই প্রযোজনায় তার সচেতন প্রয়োগ স্পষ্ট। বিশেষ করে প্রধান চরিত্রদ্বয়ের আবেগপ্রকাশ, কণ্ঠনিয়ন্ত্রণ এবং শরীরী ভাষা দর্শকের সঙ্গে একটি গভীর আবেগগত সংযোগ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।
প্রযোজনার আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো এর সাংস্কৃতিক পুনর্বিন্যাস। আরব্য লোককাহিনি, ফারসি কাব্য, বাংলা মধ্যযুগীয় সাহিত্য এবং সমকালীন নাট্যভাষা—এই চারটি ভিন্ন সাংস্কৃতিক স্তরকে একই মঞ্চে একত্রিত করা সহজ কাজ নয়। কিন্তু নির্দেশক সেই জটিল কাজটি সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন। ফলে নাটকটি অনুবাদ বা পুনর্কথন হয়ে থাকেনি; বরং নতুন সাংস্কৃতিক অর্থ উৎপাদন করেছে। এটাই একটি সফল আন্তঃসাংস্কৃতিক প্রযোজনার প্রধান বৈশিষ্ট্য।
তবে কিছু সীমাবদ্ধতার কথাও উল্লেখ করা প্রয়োজন। কয়েকটি দৃশ্যে সংলাপের গতি কিছুটা দীর্ঘায়িত হয়েছে, যার ফলে নাট্যছন্দ সাময়িকভাবে শিথিল হয়েছে। কোথাও কোথাও সংগীতের উচ্চমাত্রা সংলাপের স্বচ্ছতাকে আংশিকভাবে আড়াল করেছে। একইভাবে কয়েকটি দলগত দৃশ্যে ব্লকিং আরও সংহত হলে দৃশ্যগত শক্তি বৃদ্ধি পেত। তবে এসব সীমাবদ্ধতা সামগ্রিক প্রযোজনার শিল্পমানকে উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষুণ্ণ করেনি।
সবশেষে বলা যায়, এই লাইলী মজনু কেবল একটি শিক্ষার্থী প্রযোজনা হিসেবে মূল্যায়নের বিষয় নয়। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক নাট্যচর্চার সম্ভাবনা, গবেষণাভিত্তিক নির্দেশনা এবং সমকালীন নাট্যনন্দনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ঐতিহ্যকে পুনরাবিষ্কার করে নতুন নাট্যভাষা নির্মাণের যে প্রয়াস এই প্রযোজনায় দেখা গেছে, তা ভবিষ্যৎ বাংলা থিয়েটারের জন্য আশাব্যঞ্জক।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্চ কেবল অভিনয় শেখার জায়গা নয়; এটি নতুন ভাবনা, নতুন ভাষা এবং নতুন নন্দনতত্ত্বের পরীক্ষাগার। লাইলী মজনু সেই পরীক্ষাগারের একটি উজ্জ্বল শিল্পফল, যেখানে প্রেম ব্যক্তিগত আবেগকে ছাড়িয়ে সভ্যতার স্মৃতি, সংস্কৃতির বিবর্তন এবং মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষার এক অনন্ত প্রতীকে রূপান্তরিত হয়েছে। এই ধরনের প্রযোজনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—নাটক তখনই সত্যিকার অর্থে জীবন্ত হয়, যখন তা অতীতকে ধারণ করে বর্তমানের সঙ্গে কথা বলে এবং ভবিষ্যতের শিল্পভাষার সম্ভাবনাকে উন্মুক্ত করে।
— তরু শাহরিয়ার স্বর্গ
শিল্পী, শিক্ষক ও গবেষক, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।