২০২২ সালের ৩১ জুলাই ভোরের আলো ফোটার আগেই যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও অঙ্গরাজ্যের স্ট্রংসভিল শহর এক বীভৎস ঘটনার সাক্ষী হয়েছিল। একটি হাইস্কুল গ্র্যাজুয়েশন পার্টি শেষে ১৭ বছর বয়সী ম্যাকেঞ্জি শিরিলা যখন তাঁর টয়োটা ক্যামরি গাড়িটি নিয়ে রাজপথে নামেন, তখন তাঁর পাশে ছিলেন দীর্ঘদিনের প্রেমিক ডমিনিক রুসো এবং পেছনের সিটে বন্ধু ডেভিয়ন ফ্লানাগান। মুহূর্তের মধ্যেই সেই আনন্দযাত্রা পরিণত হয় এক হাড়হিম করা ট্র্যাজেডিতে। সম্প্রতি নেটফ্লিক্সের নতুন ডকুমেন্টারি ‘দ্য ক্র্যাশ’-এ সেই ভয়ংকর রাতের প্রতিটি পরত উন্মোচিত হয়েছে, যা বিশ্ববাসীকে আবারও স্তব্ধ করে দিয়েছে।
তদন্তকারীদের প্রাপ্ত তথ্য এবং গাড়ির ‘ব্ল্যাক বক্স’ (Black Box) বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, আবাসিক এলাকার সংকীর্ণ একটি সড়কে ম্যাকেঞ্জি তাঁর গাড়ির গতিবেগ বাড়িয়ে ঘণ্টায় ১০০ মাইল পর্যন্ত তুলেছিলেন। কোনো ধরনের ব্রেক না চেপে এবং অত্যন্ত সচেতনভাবে স্টিয়ারিং নিয়ন্ত্রণ করে তিনি গাড়িটি সরাসরি একটি ইটের ভবনে আছড়ে ফেলেন। এতে ঘটনাস্থলেই ডমিনিক রুসো ও ডেভিয়ন ফ্লানাগান প্রাণ হারান। অবিশ্বাস্যভাবে প্রাণে বেঁচে যান ম্যাকেঞ্জি, যদিও তাঁকে দীর্ঘকালীন চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।
শুরুতে ঘটনাটি সাধারণ সড়ক দুর্ঘটনা মনে হলেও পরবর্তীতে প্রসিকিউটররা এটিকে একটি সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে দাবি করেন। তদন্তে উঠে আসে ম্যাকেঞ্জি ও ডমিনিকের মধ্যকার চার বছরের বিষাক্ত সম্পর্কের ইতিহাস। দুর্ঘটনার কয়েক সপ্তাহ আগে ডমিনিক তাঁর বন্ধুকে ফোনে জানিয়েছিলেন যে তিনি ম্যাকেঞ্জির সাথে গাড়িতে থাকতে ভয় পাচ্ছেন, কারণ ম্যাকেঞ্জি চিৎকার করে বলছিলেন, “আমি এই গাড়িটি ক্র্যাশ করব।” এছাড়া দুর্ঘটনার পর ম্যাকেঞ্জির শরীরে অ্যালকোহল বা কোনো মাদকের উপস্থিতি না থাকা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোক প্রকাশের পরিবর্তে ‘পোশাক ব্র্যান্ডের’ প্রচারণা করা তাঁর বিরুদ্ধে জনমতকে আরও বিষিয়ে তোলে।
২০২৩ সালে এই মামলার রায় ঘোষণা করতে গিয়ে বিচারক কঠোর মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, “এটি কোনো বেপরোয়া ড্রাইভিং নয়; এটি একটি নিয়ন্ত্রিত এবং উদ্দেশ্যমূলক খুন।” আদালত ১৮ বছর বয়সী ম্যাকেঞ্জিকে জোড়া হত্যাকাণ্ডের দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেন, যেখানে অন্তত ১৫ বছর সাজা ভোগের আগে প্যারোলের কোনো সুযোগ নেই। এই রায়টি মার্কিন বিচার ব্যবস্থায় কিশোর অপরাধীদের জন্য এক দৃষ্টান্তমূলক নজির হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
নেটফ্লিক্সের এই তথ্যচিত্রে প্রথমবার ক্যামেরার সামনে কথা বলতে দেখা গেছে দণ্ডিত ম্যাকেঞ্জি শিরিলাকে। যদিও তিনি আগের মতোই দাবি করেছেন যে সেই রাতের কোনো স্মৃতি তাঁর মনে নেই। নির্মাতা গ্যারেথ জনসন, যিনি নিজেও কৈশোরে এক ভয়াবহ গাড়ি দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিলেন, তিনি এই প্রামাণ্যচিত্রের মাধ্যমে ডিজিটাল যুগের এক অন্ধকার প্রতিচ্ছবি তুলে ধরেছেন। এটি কেবল একটি আইনি লড়াইয়ের গল্প নয়, বরং আধুনিক কিশোর জীবনের অস্বাভাবিক চাপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মেকি ইমেজ এবং বিষাক্ত সম্পর্কের ভয়াবহ পরিণতির এক জীবন্ত দলিল।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।