মার্গারিট অ্যানি জনসন, বিশ্ব যাঁকে ‘মায়া অ্যাঞ্জেলু’ নামে চেনে, তিনি ছিলেন একাধারে বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ আমেরিকান কবি, মানবাধিকারকর্মী এবং স্মৃতিকথা লেখক। তাঁর শৈশব ছিল বর্ণবাদ আর অমানবিকতার এক বিভীষিকাময় অধ্যায়। মাত্র তিন বছর বয়সে বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের পর ট্রেনের কামরায় চড়ে দাদির কাছে যাত্রা শুরু করা মায়া বড় হয়েছিলেন এক আত্মবিশ্বাসহীনতার সংকটে। ৮ বছর বয়সে পাশবিক নির্যাতনের শিকার হওয়া এবং সেই ট্র্যাজেডির জেরে নির্বাক হয়ে যাওয়া মায়ার জীবন ছিল প্রকৃত অর্থেই এক ‘খাঁচাবন্দি’ দশা।
কিন্তু মায়া দমে যাননি। তাঁর নীরবতাকে তিনি শক্তিতে রূপ দিয়েছিলেন সাহিত্যের জাদুতে। সান ফ্রান্সিসকোর প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী ‘কন্ডাক্টর’ হিসেবে কাজ করা থেকে শুরু করে মার্টিন লুথার কিংয়ের হাত ধরে মানবাধিকার আন্দোলনের মুখ হয়ে ওঠা—মায়ার প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল ‘And still I rise’ (তবুও আমি জেগে উঠি) মন্ত্রে উদ্দীপ্ত। তাঁর ‘খাঁচার পাখি’র হাহাকার ছিল নিপীড়িত মানুষের মুক্তির গান।
মায়ার এই বিশ্বজয়ী রচনার প্রায় এক শতাব্দী আগে বাঙালির প্রাণের কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘দুই পাখি’ কবিতায় এক অনন্য রূপক তৈরি করেছিলেন। ১৮৯২ সালে যখন তিনি এই কবিতা লিখছেন, তখন তাঁর বয়স মাত্র ৩১। রবীন্দ্রনাথ হয়তো মায়ার মতো চরম দারিদ্র্য বা বর্ণবাদের শিকার হননি, তিনি ছিলেন রাজকীয় আভিজাত্যের বরপুত্র। কিন্তু তাঁর ‘জীবনস্মৃতি’ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির চার দেয়াল আর ভৃত্যদের কড়া শাসনের ‘ভৃত্যরাজক’ তন্ত্র তাঁর শৈশবকেও করে তুলেছিল অবরুদ্ধ। জানালার ওপারে গাছপালা আর মুক্ত আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা সেই শিশু রবির মনেও কি দানা বাঁধেনি কোনো অদৃশ্য খাঁচার বোধ?
মায়া এবং রবীন্দ্রনাথ—উভয়ই তাঁদের সাহিত্যে ‘পাখি’কে ব্যবহার করেছেন মুক্তির প্রতীক হিসেবে। মায়ার খাঁচার পাখি যেখানে বন্দিত্বের মাঝেও ডানা ঝাপটিয়ে লড়াই করে এবং শেষ পর্যন্ত মুক্তির জয়গান গায়, রবীন্দ্রনাথের খাঁচার পাখি সেখানে কিছুটা হতাশাবাদী। রবীন্দ্রনাথের কবিতায় খাঁচার পাখিটি শেষ পর্যন্ত বলে ওঠে— ‘হায়! মোর শকতি নাহি উড়িবার।’ এই পার্থক্যের মধ্যেও যে সত্যটি ধ্রুব হয়ে থাকে, তা হলো—মানুষের আত্মা চিরকালই শৃঙ্খলমুক্তির প্রত্যাশী।
রবীন্দ্রনাথ ‘গুরুদেব’ বা আভিজাত্যের তকমা ছেড়ে হতে চেয়েছিলেন মাটির কাছাকাছি থাকা এক গানের মানুষ। অন্যদিকে মায়া অ্যাঞ্জেলু তাঁর জীবনের প্রতিটি ধাপে—কখনো নর্তকী, কখনো লেখিকা, আবার কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিসেবে—নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করেছেন। দুই মহাপ্রাণের এই জীবনযুদ্ধ আমাদের শিখিয়ে দিয়ে গেছে যে, খাঁচাটা মানসিক হোক বা সামাজিক, তার শিকল ভাঙার শক্তি কেবল মানুষের সৃজনশীলতার ভেতরেই নিহিত থাকে। দেশ, কাল আর জাতির সীমানা পেরিয়ে মায়া ও রবীন্দ্রনাথ আজও প্রতিটি অবরুদ্ধ প্রাণের জন্য অনুপ্রেরণার এক বাতিঘর হয়ে জ্বলছেন।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।