পানির ব্যবসা নাকি মানুষের সেবা? এসকে কর্পোরেশনের সিইও কামাল উদ্দিনের 'বিশুদ্ধ' লড়াইয়ের গল্প!

বিশুদ্ধ পানি প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার। কিন্তু এই অধিকার সুনিশ্চিত করার পথটা সবার জন্য সহজ ছিল না। খুলনার মটিয়াখালীর এক সাধারণ গ্রাম থেকে উঠে আসা এক যুবক, যিনি শৈশবে নিজেই দূষিত পানির শিকারে পরিণত হয়েছিলেন, আজ তিনি দেশের পানি বিশুদ্ধকরণ শিল্পের অন্যতম পথিকৃৎ। তিনি এসকে কর্পোরেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও মোঃ কামাল উদ্দিন। ২০০০ সালে ২০ লিটারের জারের ব্যবসা দিয়ে শুরু করে আজ তিনি শত শত শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপন করছেন। তাঁর সংগ্রামী জীবন, ব্যবসায়িক দর্শন এবং আগামীর স্বপ্ন নিয়ে আমাদের আজকের এই বিশেষ আয়োজন।

 

সাক্ষাৎকার পর্বঃ 

প্রশ্ন: শুরুতে আপনার নিজের সম্পর্কে কিছু বলুন। নিজেকে কোন পরিচয়ে সবার সামনে তুলে ধরতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন?

মোঃ কামাল উদ্দিন: আমি নিজেকে একজন সেবক হিসেবে তুলে ধরতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। এসকে কর্পোরেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও হলেও, আমার কাছে মূল পরিচয় হলো - আমি এমন একটি পণ্য ও সেবা নিয়ে কাজ করি, যা মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। বিশুদ্ধ পানি প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার, আর এই অধিকার নিশ্চিত করতে আমরা কাজ করছি। তাই সিইও বা ব্যবসায়ীর চেয়ে "পানি বিশুদ্ধকরণ সেবক" হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করতে আমি বেশি ভালোবাসি।

প্রশ্ন: আপনার বেড়ে ওঠার গল্পটা যদি একটু বলতেন। শৈশবের কোনো বিশেষ ঘটনা কি আজকের এই মানুষটি হয়ে ওঠার পেছনে ভূমিকা রেখেছে?

মোঃ কামাল উদ্দিন: আমার ছোটবেলা কেটেছে খুলনা শহরের নিকটবর্তী মতিয়াখালী গ্রামের মেঠো পথে। গ্রামের কাদামাটি আর বর্ষার দিনগুলো ছিল আমার শৈশবের সঙ্গী। সেই সময় গ্রামে টিউবওয়েলের পানি ছিল না বললেই চলে, আর দূষিত পানি খেয়ে আমরা প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়তাম। একবার আমি মারাত্মক টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়েছিলাম। ডাক্তার জানিয়েছিলেন, দূষিত পানিই এর মূল কারণ। সেই কষ্ট এবং গ্রামের অসংখ্য মানুষের ভোগান্তি দেখে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম - যদি কোনোদিন সুযোগ পাই, মানুষের জন্য বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত করতে কাজ করব। আজকের এসকে কর্পোরেশনের বীজ আসলে বপন হয়েছিল শৈশবের সেই অসুস্থতার দিনগুলোতেই।

প্রশ্ন: উদ্যোক্তা হিসেবে আপনার যাত্রার শুরুটা ঠিক কীভাবে হয়েছিল? ব্যবসার এই আইডিয়াটা মাথায় এল কীভাবে?

মোঃ কামাল উদ্দিন: শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না। ২০০০ সালের দিকে আমি প্রথমে ২০ লিটারের জারের ডিস্ট্রিবিউশন দিয়ে কাজ শুরু করি। তখন খেয়াল করলাম, শহরের মানুষ কোনোমতে বিশুদ্ধ পানি পেলেও গ্রামের মানুষের অবস্থা তথৈবচ। অথচ বাজারে যেসব পিউরিফায়ার পাওয়া যেত, সেগুলোর দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে ছিল। আমি ভাবলাম, এমন কিছু করা দরকার যা সাশ্রয়ী, টেকসই এবং সহজলভ্য হবে। সেই চিন্তা থেকেই এসকে কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠা করি। ছোট পরিসরে বাসা ও অফিস থেকে শুরু করে আজ আমরা বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালে ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (WTP) স্থাপন করছি।

প্রশ্ন: নতুন কিছু শুরু করার ক্ষেত্রে আমাদের দেশে পারিবারিক সমর্থন খুব গুরুত্বপূর্ণ। আপনার ক্ষেত্রে পরিবারের ভূমিকা কেমন ছিল?

মোঃ কামাল উদ্দিন: প্রথম দিকে পরিবার খুব একটা সমর্থন দেয়নি। চাকরি ছেড়ে ব্যবসায় নামাটাকে সবাই বড় ঝুঁকি মনে করেছিল। আমার মা তো প্রথমে কেঁদেই ফেলেছিলেন। অনেকে উপহাস করে বলত, "আল্লাহর দেওয়া পানি, ওটা আবার বিক্রি করবে?" তবে আমার স্ত্রী শুরু থেকেই অটল ছিলেন। আমি যখন চাকরি ছাড়ি, তিনি তাঁর সঞ্চয় দিয়ে সংসার চালিয়েছেন। আর আমার মা, যিনি খুব বেশি শিক্ষিত ছিলেন না, তিনিই শেষ পর্যন্ত আমার বড় প্রেরণা হয়ে দাঁড়ান। তিনি বলতেন, "সৎভাবে কাজ করলে আল্লাহ কখনো বিমুখ করেন না।"

প্রশ্ন: শুরুর দিকে সবচেয়ে বড় বাধাগুলো কী ছিল এবং সেগুলো আপনি কীভাবে মোকাবিলা করেছিলেন?

মোঃ কামাল উদ্দিন: আর্থিক সংকট ছিল প্রধান বাধা। ছোট ছোট ঋণ নিয়ে আমাকে কাজ এগোতে হয়েছে। এছাড়া ছিল মানুষের আস্থার অভাব। ছোট কোম্পানি বলে অনেকেই আমাদের পণ্যের মান নিয়ে সন্দেহ করত। প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন করাও ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি। দিনে ১৬-১৭ ঘণ্টা পরিশ্রম করেছি। মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে তাদের বুঝিয়েছি। একটি করে অর্ডার পাওয়া আর সেই গ্রাহকের সন্তুষ্টিই আমাকে পরবর্তী ধাপে যাওয়ার শক্তি জুগিয়েছে।

প্রশ্ন: এই দীর্ঘ পথচলায় এমন কোনো তিক্ত অভিজ্ঞতা আছে কি, যা আপনাকে এখনও ব্যথিত করে?

মোঃ কামাল উদ্দিন: ২০১৫ সালের একটি ঘটনা আজও আমাকে পীড়া দেয়। একটি বড় প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তি অনুযায়ী আমরা পণ্য সরবরাহ করেছিলাম, কিন্তু শেষ মুহূর্তে তারা চুক্তি বাতিল করে এবং পাওনা টাকা আটকে দেয়। আমি প্রায় দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হয়েছিলাম। সেই সময়টা খুব কষ্টের ছিল। তবে আজ পেছনে ফিরে তাকালে বুঝি, ওই তিক্ত অভিজ্ঞতাই আমাকে ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আরও দৃঢ় ও সতর্ক করেছে।

প্রশ্ন: সেই কঠিন সময় থেকে আপনি ব্যবসায়িক জীবনের কোন বড় শিক্ষাটি পেয়েছেন?

মোঃ কামাল উদ্দিন: কষ্ট মানুষকে শেখায়। আমি শিখেছি কখনো একক কোনো বড় চুক্তির ওপর অন্ধভাবে নির্ভর করতে নেই। ছোট ছোট পদক্ষেপে এগিয়ে যাওয়া এবং সততা বজায় রাখাই আসল। গ্রাহকের বিশ্বাসই আমাদের মূল সম্পদ। এসকে কর্পোরেশন আজ যেখানে দাঁড়িয়ে, তার মূলে রয়েছে আমাদের সততা।

প্রশ্ন: বর্তমানে আপনার প্রতিষ্ঠানের পরিধি এবং ব্যবসার পরিধি ঠিক কতটা বেড়েছে?

মোঃ কামাল উদ্দিন: বর্তমানে আমরা শুধু ওয়াটার পিউরিফায়ার নয়, বড় পরিসরে ডব্লিউটিপি (WTP), আরওও (RO) প্ল্যান্ট এবং সফটনার প্ল্যান্ট স্থাপন করছি। ঢাকা ও সিলেটে আমাদের শাখা রয়েছে। প্রায় ৫০০-এর বেশি বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আমাদের গ্রাহক। প্রায় ৫০ জন কর্মী এখন এসকে কর্পোরেশনে কর্মরত। তবে আমার স্বপ্ন অনেক বড় - দেশের প্রতিটি ঘরে ঘরে বিশুদ্ধ পানি পৌঁছে দেওয়া।

প্রশ্ন: আপনার কাছে ‘সাফল্য’ শব্দের প্রকৃত অর্থ কী? নিজেকে কতটা সফল বলে মনে করেন?

মোঃ কামাল উদ্দিন: সাফল্য মানে কোটি টাকা আয় নয়, বরং মানুষের মুখে হাসি ফোটানো। যখন দেখি কোনো গ্রামের স্কুলে আমরা বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করেছি এবং বাচ্চারা এখন পানিবাহিত রোগ থেকে মুক্ত, সেই তৃপ্তিই আমার কাছে সবচেয়ে বড় সাফল্য। আমি নিজেকে শতভাগ সফল বলব না, কারণ এখনও দেশের অনেক মানুষ বিশুদ্ধ পানির অভাবে ধুঁকছে। আমার পথ চলা এখনও বাকি।

প্রশ্ন: এই সফলতার পেছনে কার অবদান সবচেয়ে বেশি বলে মনে করেন?

মোঃ কামাল উদ্দিন: সবার আগে আমার স্ত্রীর নাম বলব, যিনি আমার চরম দুর্দিনেও পাশে ছিলেন। এরপর আমার মা এবং আমার সেই শুরুর দিকের গ্রাহকবৃন্দ, যারা একটি ছোট কোম্পানির ওপর আস্থা রেখেছিলেন। এছাড়া আমার এক বড় ভাই, যিনি আমাকে সবসময় সৎ থাকার পরামর্শ দিতেন, তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।

প্রশ্ন: বর্তমান বাজারে এই খাতের প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো কী কী?

মোঃ কামাল উদ্দিন: সচেতনতার অভাব বড় একটি চ্যালেঞ্জ। অনেকে মনে করেন পানি ফুটালেই সব সমস্যা শেষ, অথচ আর্সেনিক বা ভারী ধাতু ফোটানোর মাধ্যমে দূর করা সম্ভব নয়। এছাড়া বাজারে নিম্নমানের পণ্যের ছড়াছড়ি রয়েছে, যা পুরো ইন্ডাস্ট্রির সুনাম নষ্ট করছে। আমরা চাই সরকার এই খাতে আরও ভর্তুকি এবং সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করুক।

প্রশ্ন: নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য আপনার বিশেষ কোনো উপদেশ আছে কি?

মোঃ কামাল উদ্দিন: নতুনদের উদ্দেশ্যে আমার পরামর্শ হলো - 
১. ব্যবসায় সততাই সবচেয়ে বড় মূলধন।
২. ছোট করে শুরু করুন এবং ধৈর্য ধরুন।
৩. শুধু পণ্য বিক্রি করবেন না, গ্রাহকের সমস্যার সমাধান দিন।
৪. প্রযুক্তিগতভাবে নিজেকে আপডেট রাখুন।
মনে রাখবেন, ব্যবসা শুধু টাকা কামানোর জায়গা নয়, এটি মানুষের সেবার একটি মাধ্যম। এই আদর্শ থাকলে সাফল্য আসবেই।


মোঃ কামাল উদ্দিনের মতো উদ্যোক্তারা প্রমাণ করেন যে, স্বপ্ন পূরণের জন্য সৎ প্রচেষ্টা আর অদম্য পরিশ্রমই যথেষ্ট। শৈশবের সেই টাইফয়েড আক্রান্ত ছেলেটি আজ হাজার হাজার মানুষের সুপেয় পানি নিশ্চিত করছেন। এসকে কর্পোরেশন আজ কেবল একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নয়, এটি এক ফোঁটা বিশুদ্ধ পানির নিশ্চয়তা। তাঁর এই সংগ্রামী ও অনুপ্রেরণামূলক যাত্রা বাংলাদেশের উদীয়মান উদ্যোক্তাদের জন্য এক ধ্রুবতারা হয়ে থাকবে। কামাল উদ্দিনের এই লড়াই জারি থাকুক, প্রতিটি ঘর হোক পানিবাহিত রোগমুক্ত—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

 

- ফিচার ডেস্ক