ব্যর্থতার তিক্ততাকে ‘জেদ’ বানিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণা: স্বপ্নদ্রষ্টা আব্দুর রহমান মামুন

ব্যর্থতার তিক্ততাকে ‘জেদ’ বানিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণা: স্বপ্নদ্রষ্টা আব্দুর রহমান মামুন

মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড় - কথাটি আমরা বহুবার শুনেছি, কিন্তু বাস্তবে এর রূপকার খুব কম মানুষই হতে পারেন। তেমনই একজন স্বপ্নবাজ মানুষ আব্দুর রহমান মামুন। পড়াশোনায় তথাকথিত 'ফার্স্ট বয়' না হয়েও, এবং পাইলট হওয়ার স্বপ্ন পূরণ না হলেও, তিনি নিজের জন্য তৈরি করেছেন এক ভিন্ন আকাশ। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার ধুলোবালি মেখে বড় হওয়া এই তরুণ আজ বাংলাদেশের শিক্ষা, বস্ত্র, আবাসন, জ্বালানি এবং কৃষি খাতের অন্যতম সফল উদ্যোক্তা। মেন্টরশিপ, একাগ্রতা আর সততাকে পুঁজি করে শূন্য থেকে কীভাবে বড় বড় শিল্পগোষ্ঠী গড়ে তোলা যায়, তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তিনি। কোভিড-১৯ মহামারির ভয়াবহ ধাক্কা আর ঋণের বোঝা সামলে কীভাবে তিনি সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছালেন, আজ আমরা তার মুখ থেকেই শুনবো সেই অদম্য যাত্রার গল্প।

সাক্ষাৎকার পর্ব:

প্রশ্ন: শুরুতে আপনার নিজের সম্পর্কে একটু বলুন। নিজেকে কোন পরিচয়ে সবার সামনে তুলে ধরতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন? 

আব্দুর রহমান মামুন: আমি মূলত একজন স্বপ্নদ্রষ্টা, যাকে বাস্তবায়নের নেশায় আমি একজন 'উদ্যোক্তা' হিসেবে পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। পেশাগতভাবে আমি একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, কিন্তু আমার সত্তা জুড়ে রয়েছে মানুষের মৌলিক প্রয়োজনগুলো পূরণের এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং আমাদের পরিবেশ - এই ৬টি স্তম্ভকে ঘিরে আমার সমস্ত ব্যবসায়িক উদ্যোগ আবর্তিত হচ্ছে। 

প্রশ্ন: আপনার বেড়ে ওঠা কোথায়? ছোটবেলার কোনো স্মৃতি কি আজকের এই মানুষটি হয়ে ওঠার পেছনে ভূমিকা রেখেছে? 

আব্দুর রহমান মামুন: আমার শিকড় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায়। স্কুল-কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে লন্ডন মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটিতে আইটি নিয়ে পড়াশোনা করলেও, আমি কখনোই তথাকথিত ‘ফার্স্ট বয়’ ছিলাম না। ছোটবেলায় আকাশে প্লেন উড়তে দেখলে পাইলট হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম। কিন্তু হয়তো স্রষ্টা আমার জন্য অন্য কোনো আকাশ লিখে রেখেছিলেন। পড়াশোনায় খুব বেশি ভালো না হওয়াটাই বোধহয় আমাকে ভিন্ন কিছু করার ‘জেদ’ জুগিয়েছিল। সেই জেদ থেকেই আমার ব্যবসায় আসা। 

প্রশ্ন: উদ্যোক্তা হিসেবে আপনার যাত্রার শুরুটা ঠিক কীভাবে হয়েছিল? 

আব্দুর রহমান মামুন: ব্যবসায়ের হাতেখড়িটা ছিল খুব অদ্ভুত - ক্লাস এইটে পড়ার সময় মোমবাতি বানিয়ে বিক্রির মাধ্যমে! তবে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ২০১৩ সালে। মাত্র ১০ হাজার টাকা পুঁজি আর পার্টনার রায়হান নোবেলের সাথে উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টরে এক রুমের সাবলেট অফিসে আমাদের শুরু। তখন স্কুলগুলোর সব কাজ হতো হাতে-কলমে। আমরা ভাবলাম, প্রযুক্তির ছোঁয়ায় যদি শিক্ষা ব্যবস্থাকে সহজ করা যায়? সেই ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় 'এডুম্যান'। পরবর্তীতে বন্ধুদের হাত ধরে অন্যান্য খাতেও যুক্ত হই। ছোটবেলার বন্ধু তনু কুমার সাহার সাথে মাত্র ৩৬টি মেশিন নিয়ে ‘ড্রিম টেক্সটাইল’ শুরু করি। নাজমুল হাসানের হাত ধরে ‘ওয়ে হাউজিং’ এবং শাকিল আহমেদের সাথে ‘ইজি এলপিজি’র যাত্রা শুরু হয়। প্রতিটি উদ্যোগই শুরু হয়েছে কোনো না কোনো সামাজিক সমস্যা সমাধানের তাগিদ থেকে। 

প্রশ্ন: নতুন ব্যবসায় আপনার পরিবারের ভূমিকা কেমন ছিল? 

আব্দুর রহমান মামুন: আমাদের পরিবারে কেউ কখনো ব্যবসা করেনি, তাই আমাকে পুরোপুরি স্রোতের বিপরীতে হাঁটতে হয়েছে। মধ্যবিত্ত পরিবার হওয়ায় তারা হয়তো আমাকে আর্থিক সচ্ছলতা দিতে পারেনি, কিন্তু তারা আমাকে সবচেয়ে বড় সম্পদটি দিয়েছিল - আর তা হলো 'স্বাধীনতা'। আমার বাবা-মা এবং চাচার অগাধ বিশ্বাস আর দোয়াই ছিল আমার সবচেয়ে বড় মূলধন। 

প্রশ্ন: শুরুর দিকের চ্যালেঞ্জগুলো কেমন ছিল এবং সেগুলো কীভাবে পার করেছেন? 

আব্দুর রহমান মামুন: পুঁজিহীন একজন তরুণের জন্য ব্যবসা করাটা কতটা কঠিন, তা আমি হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। মায়ের গয়না থেকে শুরু করে জমি বিক্রি - সবই করতে হয়েছে। সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে যখন ব্যবসা খারাপ যায়; তখন কাছের মানুষেরাও অচেনা হয়ে যায়। কিন্তু আমার শক্তি ছিল স্রষ্টার ওপর অগাধ বিশ্বাস এবং ভুল থেকে শেখার মানসিকতা। 

প্রশ্ন: এই দীর্ঘ পথচলায় এমন কোনো তিক্ত অভিজ্ঞতা কি আছে, যা আজও আপনাকে ভাবায়? 

আব্দুর রহমান মামুন: কোভিড-১৯ সময়কালটি আমার জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়। আমার প্রতিটি ব্যবসা লসের মুখে পড়ে, আমি ঋণে জর্জরিত হয়ে যাই। ব্যাংকের দায়ভার আর কাছের কিছু মানুষের মুখ ফিরিয়ে নেওয়া আমাকে মানসিকভাবে নিঃস্ব করে দিয়েছিল। সেই নিঃসঙ্গতা আর অসহায়ত্বের স্মৃতি আজও মাঝে মাঝে স্তব্ধ করে দেয়। 

প্রশ্ন: সেই হতাশা থেকে কীভাবে ঘুরে দাঁড়ালেন? 

আব্দুর রহমান মামুন: আমি ভেঙে পড়িনি, বরং সেই তিক্ততাকে আমার 'জেদ' বানিয়েছি। আমি বিশ্বাস করি, প্রতিটি ভুল বা ব্যর্থতা আসলে একটি নতুন শিক্ষার পথ। ব্যর্থতা মানেই শেষ নয়, বরং নতুনভাবে শুরু করার একটি সুযোগ মাত্র। কাজ করলে ভুল হবেই, কিন্তু দমে যাওয়া যাবে না। 

প্রশ্ন: বর্তমানে আপনার ব্যবসার পরিধি কতটুকু? একটু সংক্ষেপে যদি বলতেন। 

আব্দুর রহমান মামুন: বর্তমানে আমার পথচলাটি কয়েকটি সুসংগঠিত সেগমেন্টে বিভক্ত: 

এডুকেশন টেকনোলজি (EdTech): আমাদের তৈরি "এডুম্যান" সফটওয়্যারটির মাধ্যমে ২০২২ সাল পর্যন্ত ৫,০০০-এর বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ডিজিটালাইজড করেছি। এছাড়া বিশ্বখ্যাত মার্কিন এডটেক কোম্পানি ‘নেটকম লার্নিং’-এর বাংলাদেশ কান্ট্রি হেড হিসেবে আমি কাজ করছি, যারা ফরচুন ১০০০ তালিকার ৮০ শতাংশ কোম্পানিকে সেবা দেয়। 

টেক্সটাইল ও ফ্যাশন: ‘ড্রিম টেক্সটাইল’-এর নিজস্ব কারখানায় এখন ১১০০টিরও বেশি অত্যাধুনিক মেশিন রয়েছে। প্রতি মাসে গড়ে ২২ লক্ষ গজেরও বেশি উচ্চমানের গ্রে-ফেব্রিক উৎপাদন করছি আমরা। 

 

রিয়েল এস্টেট ও আবাসন: ‘ওয়ে হাউজিং লিমিটেড’-এর মাধ্যমে আমরা শুধু ইট-পাথরের দেয়াল নয়, মফস্বল শহরগুলোতে আধুনিক নাগরিক সুবিধা পৌঁছে দিচ্ছি। ইতিমধ্যে ৪,০০০-এর বেশি হাউজিং ইউনিট বিক্রি করেছি। 

গ্রিন এনার্জি: ‘ইজি এলপিজি’র মাধ্যমে ঢাকা সহ ৪টি জেলায় ১৫০০-এর বেশি ফ্ল্যাট এবং ১০টিরও বেশি বড় ইন্ডাস্ট্রিতে নিরাপদ এলপিজি সলিউশন স্থাপন করেছি। 

এগ্রো ইন্ডাস্ট্রি: সিরাজগঞ্জে ১৮ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত ‘ওয়ে এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড’-এর মাধ্যমে পোলট্রি, ক্যাটল এবং ফিশ ফিড উৎপাদিত হচ্ছে।

প্রশ্ন: আপনার কাছে 'সাফল্য'-এর সংজ্ঞা আসলে কী? 

আব্দুর রহমান মামুন: সাফল্য আমার কাছে কেবল ব্যাংকের ব্যালেন্স শিট নয়, বরং নিজের কাজের মাধ্যমে মানুষের জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলা। যখন দেখি আমার প্রতিষ্ঠানে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে, তখন নিজেকে সার্থক মনে হয়। সাফল্য কোনো গন্তব্য নয়, এটি একটি নিরন্তর যাত্রা। 

প্রশ্ন: এই দীর্ঘ পথচলায় তরুণ উদ্যোক্তা বা পাঠকদের জন্য আপনার কোনো 'লাইফ লেসন' আছে কি? 

আব্দুর রহমান মামুন: জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো - "ভুল করতে ভয় পাবেন না, কিন্তু একই ভুল বারবার করবেন না।" ব্যবসা মানেই অনিশ্চয়তা, তবে সততা আর লেগে থাকার মানসিকতা থাকলে পথ নিজেই তৈরি হয়ে যাবে। আর তরুণদের বলব, শূন্য থেকে শুরু করতে ভয় পেয়ো না। মনে রাখবে, অন্ধকার যত গভীর হয়, সূর্য ওঠার সময় তত কাছে আসে।  

প্রশ্ন: আগামী ৫ বা ১০ বছরে আপনার ব্যবসাকে কোথায় দেখতে চান? 

আব্দুর রহমান মামুন: আগামী ১০ বছরে আমি আমার এই খাতগুলোকে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানে দেখতে চাই। প্রযুক্তির সাথে মৌলিক চাহিদার সমন্বয় ঘটিয়ে একটি ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ বিনির্মাণে ভূমিকা রাখাটাই আমার লক্ষ্য। আমি এমন এক শিল্পগোষ্ঠী গড়ে তুলতে চাই, যা শুধু মুনাফা নয়, বরং 'মানবিক সেবা'র উদাহরণ হবে। 

সাফল্য কোনো জাদুর কাঠি নয়, এটি ঘাম, মেধা, সততা আর নিরন্তর জেদের ফসল।এই উঠে আসার গল্প আমাদের শেখায় যে, পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি যতই প্রতিকূল হোক না কেন, নিজের স্বপ্নের প্রতি সৎ থাকলে যেকোনো বাধাই অতিক্রম করা সম্ভব। দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখার পাশাপাশি হাজারো তরুণের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে তিনি আজ অনেকেরই অনুপ্রেরণা। আগামীতে তার এই উদ্যোগগুলো দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বমঞ্চেও বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা। 


- ফিচার ডেস্ক