প্রকৃতির এক বিস্ময়কর সৃষ্টি প্যাঙ্গোলিন। বন্য পরিবেশে নিজেকে শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করার জন্য বিবর্তনের ধারায় এই প্রাণীর শরীরে তৈরি হয়েছে শক্ত এক বর্ম। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে, যে শক্তিশালী আঁশ সিংহ বা চিতার থাবা থেকে প্যাঙ্গোলিনকে সুরক্ষা দেয়, সেই আঁশই এখন তার প্রধান শত্রুতে পরিণত হয়েছে। বিশ্বজুড়ে এই আঁশের আকাশচুম্বী চাহিদার কারণে প্যাঙ্গোলিন বর্তমানে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি পাচার হওয়া স্তন্যপায়ী প্রাণীর তালিকায় শীর্ষে উঠে এসেছে। ‘বিশ্ব প্যাঙ্গোলিন দিবস’ উপলক্ষে এই লাজুক ও নিরীহ প্রাণীর চরম দুর্দশার চিত্র ফের সামনে এনেছেন বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকর্মীরা।
বিপন্ন উদ্ভিদ ও প্রাণীর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণকারী বৈশ্বিক সংস্থা সিআইটিইএস (CITES)-এর এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০১৬ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে পাচারবিরোধী অভিযানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় ৫ লাখের বেশি প্যাঙ্গোলিন জব্দ করা হয়েছে। এই পরিসংখ্যান কেবল উদ্ধারকৃত প্যাঙ্গোলিনের; তবে প্রকৃত চিত্র আরও ভয়াবহ। ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ডের তথ্যমতে, গত এক দশকে বন্য পরিবেশ থেকে অন্তত ১০ লাখেরও বেশি প্যাঙ্গোলিন শিকারিদের জালে ধরা পড়েছে, যার একটি বড় অংশই শেষ পর্যন্ত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
প্যাঙ্গোলিন পাচারের নেপথ্যে রয়েছে দুটি প্রধান কারণ। কিছু সংস্কৃতিতে এর মাংসকে অত্যন্ত সুস্বাদু খাবার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে পাচারের মূল চালিকাশক্তি হলো এর শরীরের ‘কেরাটিন’ দিয়ে তৈরি আঁশ। বিশেষ করে চীন ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে যে, প্যাঙ্গোলিনের আঁশ দিয়ে তৈরি ওষুধ দুরারোগ্য ব্যাধি নিরাময় করতে পারে। যদিও আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে এর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি বা প্রমাণ আজও মেলেনি।
বিশ্বে বর্তমানে আট প্রজাতির প্যাঙ্গোলিন টিকে আছে, যার মধ্যে চারটি আফ্রিকা ও চারটি এশিয়া মহাদেশের বাসিন্দা। উদ্বেগের বিষয় হলো, আটটি প্রজাতিই এখন বিলুপ্তির চরম ঝুঁকির মুখে রয়েছে। প্যাঙ্গোলিনকে অনেক সময় ‘আঁশওয়ালা পিপীলিকাভুক’ বলা হলেও এদের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হলো পুরো শরীর কেরাটিনের আঁশে ঢাকা থাকা। বিপদে পড়লে এরা নিজেকে গুটিয়ে একটি শক্ত গোলক বা বলের মতো করে ফেলে, যার ফলে হিংস্র শিকারি প্রাণীর পক্ষেও একে দাঁত দিয়ে ছিদ্র করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। কিন্তু এই অদম্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মানুষের আধুনিক মারণাস্ত্র ও জালের কাছে হার মানছে।
বন্যপ্রাণী পাচারের এই বৈশ্বিক সংকটের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছে নাইজেরিয়া। সেখানে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে প্যাঙ্গোলিন উদ্ধারে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন বন্যপ্রাণী চিকিৎসক এবং ওয়াইল্ড আফ্রিকার প্রতিনিধি ড. মার্ক অফুয়া। তিনি বর্তমানে নাইজেরিয়ার লাগোসে একটি বিশেষ উদ্ধারকেন্দ্র ও ‘প্যাঙ্গোলিন অনাথ আশ্রম’ পরিচালনা করছেন। ড. অফুয়া জানান, সচেতনতার অভাবে এই প্রাণীটি নাইজেরিয়ার সাধারণ মানুষের কাছেও অপরিচিত। একবার একদল কিশোর খাঁচায় থাকা উদ্ধারকৃত প্যাঙ্গোলিন দেখে তাকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘এগুলো কি ড্রাগনের বাচ্চা?’
প্যাঙ্গোলিন রক্ষায় ড. অফুয়া এখন শিশুদের জন্য বিশেষ টিভি অনুষ্ঠান পরিচালনা করছেন এবং প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী ও ‘সেলিব্রিটি’দের এই সচেতনতা অভিযানে যুক্ত করছেন। তাঁর মতে, মানুষ যদি প্রাণিটিকে চিনতেই না পারে, তবে একে রক্ষা করা অসম্ভব। প্রকৃতির এই অনন্য সদস্যকে পৃথিবী থেকে মুছে যাওয়া থেকে বাঁচাতে এখন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কঠোর আইনি পদক্ষেপ ও ব্যাপক জনসচেতনতা প্রয়োজন।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।