দ্বিগুণ দামে আরও তিন কার্গো এলএনজি আমদানির অনুমোদন, ব্যয় ২,৬৫৪ কোটি টাকা

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের উত্তাপে বিশ্ববাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দামে আগুন লেগেছে। মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে স্পট মার্কেট বা খোলাবাজারে এলএনজির দাম বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এই নজিরবিহীন মূল্যবৃদ্ধির মধ্যেই দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রায় দ্বিগুণ দামে আরও তিন কার্গো এলএনজি আমদানির প্রস্তাবে অনুমোদন দিয়েছে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। উল্লেখ্য, মাত্র এক সপ্তাহ আগেও প্রায় একই দামে আরও দুই কার্গো এলএনজি কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সরকার।


বুধবার অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠিত ক্রয় কমিটির বৈঠকে এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, এই তিন কার্গো এলএনজি যুক্তরাজ্য ও দক্ষিণ কোরিয়ার দুটি আন্তর্জাতিক কোম্পানি থেকে সংগ্রহ করা হবে। এর মধ্যে এক কার্গো সরবরাহ করবে যুক্তরাজ্যের ‘টোটাল এনার্জিস গ্যাস অ্যান্ড পাওয়ার’ এবং বাকি দুই কার্গো সরবরাহ করবে দক্ষিণ কোরিয়ার ‘পস্কো ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশন’।


প্রতিটি কার্গোতে ৩৩ লাখ ৬০ হাজার মিলিয়ন মেট্রিক ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (এমএমবিটিইউ) এলএনজি থাকে। এবারের কেনাকাটায়, টোটাল এনার্জিস থেকে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির জন্য বাংলাদেশকে পরিশোধ করতে হবে ২১ দশমিক ৫৮ মার্কিন ডলার। অন্যদিকে, পস্কো ইন্টারন্যাশনালের কাছ থেকে কেনা দুই কার্গোর জন্য প্রতি এমএমবিটিইউর দাম পড়বে ২০ দশমিক ৭৬ ডলার।


এই তিন কার্গো এলএনজি আমদানি করতে সরকারের মোট ব্যয় হবে ২ হাজার ৬৫৪ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। জ্বালানি বিভাগের পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি বছরের ৫-৬ এপ্রিল প্রথম, ৯-১০ এপ্রিল দ্বিতীয় এবং ১২-১৩ এপ্রিল তৃতীয় কার্গোটি দেশে পৌঁছাবে।


বিশ্ববাজারে দামের এই উল্লম্ফনের চিত্রটি গত কয়েক মাসের তথ্যের সঙ্গে তুলনা করলেই স্পষ্ট হয়। গত বছরের ৯ ডিসেম্বর একই কোম্পানি, অর্থাৎ যুক্তরাজ্যের টোটাল এনার্জিস থেকে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজি কেনা হয়েছিল মাত্র ১০ দশমিক ৩৭ ডলারে। তার আগে ৪ মার্চ গানভর সিঙ্গাপুর থেকে প্রতি এমএমবিটিইউ ২৮.২৮ ডলারে এবং ভিটল এশিয়া থেকে ২৩.০৮ ডলারে এলএনজি কেনার সিদ্ধান্ত হয়েছিল।


বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে এলএনজি পরিবহন কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে, যা বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খলে মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। এই হামলার আগে স্পট মার্কেটে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম ১২ থেকে ১৫ ডলারের মধ্যে ওঠানামা করছিল। বিশ্বের মোট এলএনজির প্রায় ২০ শতাংশই পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়।


বৈঠকের অন্যান্য সিদ্ধান্ত


একই বৈঠকে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে। এর মধ্যে ইলেকট্রিসিটি জেনারেশন কোম্পানি অব বাংলাদেশ লিমিটেডের (ইজিসিবি) নির্মিত সিদ্ধিরগঞ্জের ২৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ৮ বছর ৬ মাস ৩ দিন মেয়াদে লেভেলাইজড ট্যারিফ নির্ধারণ করা হয়েছে, যার জন্য মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ২১৫ কোটি ১৪ লাখ টাকা।


এছাড়া, নিম্ন আয়ের পরিবারের কাছে ভর্তুকি মূল্যে বিতরণের জন্য ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) আওতায় ১ কোটি ৮০ লাখ লিটার রাইস ব্র্যান তেল কেনার প্রস্তাবেও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতে সরকারের ব্যয় হবে প্রায় ৩০৬ কোটি টাকা। প্রতি লিটার ১৬৯ টাকা ২৫ পয়সা থেকে ৭০ টাকা ৭৫ পয়সা দরে এই তেল সরবরাহের কাজ পেয়েছে যশোরের মজুমদার ব্র্যান অয়েল মিলস, ঢাকার মজুমদার প্রোডাক্টস, গ্রিন অয়েল অ্যান্ড পোলট্রি ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ, তামিম অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ এবং গাইবান্ধার প্রধান অয়েল মিলস।


ক্রয় কমিটির বৈঠকের পাশাপাশি এদিন অর্থনৈতিক বিষয়–সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠকে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশনের (বিটিএমসি) নিয়ন্ত্রণাধীন মাগুরা টেক্সটাইল মিলকে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারি (পিপিপি) ভিত্তিতে পুনরায় চালুর জন্য বেসরকারি অংশীদার চূড়ান্ত করা হয়েছে।


ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।