তিন বছরে নতুন দরিদ্র ৯০ লাখ মানুষ; ‘ক্যাশলেস সোসাইটি’ গড়তে বড় দাওয়াই উপদেষ্টা তিতুমীরের

দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখা এবং একটি আধুনিক ‘ক্যাশলেস সোসাইটি’ বা নগদ লেনদেনবিহীন সমাজ বিনির্মাণে দেশের প্রতিটি নাগরিককে আনুষ্ঠানিক তফসিলি ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতায় আসার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। গতকাল মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ) আয়োজিত এক বিশেষ কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। ‘দারিদ্র্য বিমোচন ও নারী ক্ষমতায়নে মাইক্রোক্রেডিট: প্রভাব ও নির্ধারক’ শীর্ষক এই সেমিনারে দেশের বর্তমান আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির কিছু উদ্বেগজনক পরিসংখ্যানও তুলে ধরা হয়।


উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর তাঁর বক্তব্যে দেশের ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য, নারী নির্যাতন এবং বাল্যবিবাহের হার নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বিভিন্ন গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে জানান, বিগত তিন বছরে দেশের প্রায় ৯০ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। একই সঙ্গে ১৮ বছরের নিচে বাল্যবিবাহের হার বর্তমানে প্রায় ৫১ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে, যা জাতীয় উন্নয়নের পথে একটি বড় অন্তরায়। এই প্রতিকূলতা মোকাবিলায় সরকার সর্বজনীন ফ্যামিলি কার্ড এবং কৃষক কার্ডের মতো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি আরও জোরদার করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।


অর্থনৈতিক উত্তরণের জন্য উপদেষ্টা তিতুমীর তিনটি প্রধান স্তম্ভের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। প্রথমত, তিনি মাইক্রোক্রেডিট বা ক্ষুদ্রঋণ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে আনুষ্ঠানিক তফসিলি ব্যাংকিং কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পরামর্শ দেন, যাতে একটি স্বচ্ছ ও আধুনিক ক্যাশলেস অর্থনীতি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। দ্বিতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদী মুদ্রাস্ফীতির নেতিবাচক প্রভাব থেকে সাধারণ মানুষকে বাঁচাতে এবং উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরিতে সমবায়ভিত্তিক ক্রয়-বিক্রয় কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, ‘ইকোনমিকস অব স্কেল’ ব্যবহারের মাধ্যমে পণ্যমূল্য সহনীয় রাখা এবং স্থানীয় পর্যায়ে ‘ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক মডেল’ চালু করা এখন সময়ের দাবি। তৃতীয়ত, তিনি দেশের আনুষ্ঠানিক শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপর বিশেষ জোর দেন, যা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে অপরিহার্য।


কর্মশালায় এমআরএর নির্বাহী ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. সাইফ উদ্দিন আহমেদ। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কুমিল্লা বার্ড-এর পরিচালক রঞ্জন কুমার গুহ। তিনি তাঁর বিশ্লেষণে দেখান যে, ক্ষুদ্রঋণ খাত গ্রামীণ অর্থনীতিতে অবদান রাখলেও এর সুফল মূলত ‘মধ্যম দরিদ্র’ শ্রেণির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে। ফলে অতি দরিদ্র বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এখনো কাঙ্ক্ষিত আর্থিক সুবিধার বাইরে রয়ে গেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক সুভাশীষ বড়ুয়া এই প্রভাব মূল্যায়নে আরও শক্তিশালী ও বৈজ্ঞানিক গবেষণা পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন। এই সমন্বিত উদ্যোগগুলো সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।


ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।