সুপারহিরো সিনেমার জগত এখন বহুমাত্রিক, তবে সব চরিত্রকে ছাপিয়ে একটি নাম গত কয়েক দশক ধরে দর্শকদের হৃদয়ে অবিচল স্থান করে নিয়েছে— ‘স্পাইডার-ম্যান’। ২০২১ সালের শেষভাগে যখন ‘স্পাইডার-ম্যান: নো ওয়ে হোম’ বড় পর্দায় মুক্তি পেল, তখন বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছিল এক নজিরবিহীন উন্মাদনা। শুধুমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই ছবিটি ৮১৪ মিলিয়ন ডলারের ব্যবসা করে বক্স অফিসের সব হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিয়েছিল। সমালোচকদের মতে, সুপারহিরো ছবি নিয়ে দর্শকদের মনে যে একঘেয়েমি দানা বেঁধেছিল, এই একটি ছবি যেন জাদুর কাঠির স্পর্শে তা উড়িয়ে দিল। টম হল্যান্ড, অ্যান্ড্রু গারফিল্ড এবং টোবি ম্যাগুইরে—তিন প্রজন্মের তিন স্পাইডার-ম্যানের একই ফ্রেমে উপস্থিতি যেন ছিল এক রাজকীয় পুনর্মিলনী।
তবে স্পাইডার-ম্যানের এই অবিস্মরণীয় সাফল্যের পেছনে কেবল তারকাদের সমাবেশই বড় কারণ নয়। এর ভিত্তি রচিত হয়েছিল আরও আগে। ২০১৮ সালে মুক্তি পাওয়া ‘স্পাইডার-ম্যান: ইনটু দ্য স্পাইডার-ভার্স’ কমিক বুক সিনেমার ব্যাকরণ বদলে দিয়েছিল। মাল্টিভার্স বা বহুমাত্রিক মহাবিশ্বের যে ধারণা সেই অ্যানিমেশন ছবিতে দেখানো হয়েছিল, ‘নো ওয়ে হোম’-এর নির্মাতারা তাকেই লাইভ-অ্যাকশন ফরম্যাটে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে ‘স্পাইডার-ম্যান: ব্র্যান্ড নিউ ডে’ নিয়ে আলোচনা প্রমাণ করে যে, দর্শকদের কাছে এই ফ্র্যাঞ্চাইজির আবেদন এখনো অমলিন। যেখানে টম হল্যান্ডের পিটার পার্কার ও জেনডায়ার অভিনীত এমজে-র আবেগঘন রসায়ন দর্শকদের নতুন করে আবিষ্ট করেছে।
প্রশ্ন জাগতে পারে, ১৯৬২ সালে স্ট্যান লির হাত ধরে জন্ম নেওয়া এই কিশোর চরিত্রটি কেন ‘সুপারম্যান’ বা ‘ব্যাটম্যান’–এর মতো বিশাল ব্যক্তিত্বদের টেক্কা দিচ্ছে? মার্কিন কমিক-বুক সিনেমার দীর্ঘ ইতিহাসে ক্রিস্টোফার রিভের ‘সুপারম্যান’ ছিল এক পৌরাণিক ও অজেয় মহিমা। অন্যদিকে, ক্রিস্টোফার নোলানের ‘দ্য ডার্ক নাইট’ ট্রিলজিতে ব্যাটম্যানের অস্তিত্ববাদী অন্ধকার ও নিঃসঙ্গতা দর্শকদের মন জয় করেছিল। তবুও, স্পাইডার-ম্যানের আকর্ষণ এখানে একটু ভিন্ন। টম হল্যান্ড যেভাবে একজন সাধারণ স্কুলছাত্র থেকে সুপারহিরো হয়ে ওঠার লড়াই ফুটিয়ে তুলেছেন, তা এক কথায় অনবদ্য। অ্যান্ড্রু গারফিল্ডের বিষণ্নতা কিংবা টোবি ম্যাগুইরের সরলতা ছাপিয়ে হল্যান্ড এখন দর্শকদের কাছে হয়ে উঠেছেন ‘আমাদের ঘরের ছেলে’।
আসলে স্পাইডার-ম্যানের মূল শক্তি তার অতিমানবীয় ক্ষমতায় নয়, বরং তার ‘সাধারণ’ হয়ে ওঠার মধ্যে। পিটার পার্কার চরিত্রটি আমাদের সমাজেরই একজন প্রতিনিধি। বয়ঃসন্ধির জটিলতা, স্কুলের বুলিং, প্রেমিকার সাথে মান-অভিমান কিংবা গোপন পরিচয় সামলানোর যে নিরন্তর লড়াই—তা সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের জীবন সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। সে নিউইয়র্কের সুউচ্চ দালানের মাঝে জাল ছুড়ে ঝুলে থাকলেও তার মন পড়ে থাকে পাশের গলির বন্ধু কিংবা পরিবারের কাছে। এই স্থানীয় ও ঘরোয়া আবহ স্পাইডার-ম্যানকে অন্য যে কোনো সুপারহিরোর চেয়ে বেশি ‘রিলেটেবল’ বা সম্পর্কিত করে তুলেছে।
বর্তমান অস্থির সময়ে স্পাইডার-ম্যান যেন আমাদের সময়ের আয়না। সে সুপারম্যানের মতো সর্বশক্তিমান নয়, আবার ব্যাটম্যানের মতো অঢেল সম্পদের মালিকও নয়। সে ভুল করে, প্রেমে পড়ে, ব্যর্থ হয় এবং পুনরায় সাহসের সাথে ঘুরে দাঁড়ায়। আমেরিকান সংস্কৃতির সেই লাল-নীল পোশাক পরা নায়ক আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমরাও হয়তো মাঝে মাঝে পরিস্থিতির ফেরে একটি সুতোয় ঝুলে থাকি, কিন্তু সেই ঝুলে থাকার মধ্যেও বেঁচে থাকার এক অসাধারণ রোমাঞ্চ লুকিয়ে আছে। আর ঠিক এই কারণেই স্পাইডার-ম্যান কেবল একটি চরিত্র নয়, বরং কোটি মানুষের কাছে এক অদম্য অনুপ্রেরণার নাম।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।