নব্বইয়ের দশকের বলিউডে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে আবির্ভাব ঘটেছিল নিকি অ্যানেজার। তাঁর মোহনীয় মুখাবয়ব আর পর্দা কাঁপানো উপস্থিতি দেখে প্রখ্যাত পরিচালক মুকুল আনন্দ ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, ‘তুমি হবে সেরাদের সেরা।’ বি-টাউনের কিংবদন্তি মেকআপ আর্টিস্ট মিকি কন্ট্রাক্টর নিকিকে দেখার পর প্রথম মন্তব্য করেছিলেন যে, তাঁর সঙ্গে মাধুরী দীক্ষিতের অবিশ্বাস্য মিল রয়েছে। এরপর থেকেই ইন্ডাস্ট্রিতে তিনি ‘দ্বিতীয় মাধুরী’ হিসেবে পরিচিতি পান। তবে সেই বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও নিকি অ্যানেজার ক্যারিয়ারের গতিপথ ছিল অনেকটাই নাটকীয় ও কণ্টকাকীর্ণ।
নিকির রুপালি পর্দায় আসার গল্পটি কোনো চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যের চেয়ে কম নয়। তিনি আসলে চেয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনে গিয়ে পাইলট হওয়ার প্রশিক্ষণ নিতে। কিন্তু রক্ষণশীল পিতার আপত্তিতে সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। পরে জেদের বশেই আত্মীয় পারমিত সেতির বাড়িতে গিয়ে অভিনেত্রী অর্চনা পুরান সিংয়ের পোশাক ধার করে একটি ফটোশুট (Portfolio) করেন। সেই ছবিগুলোই তাঁর জন্য খুলে দেয় গ্ল্যামার জগতের দরজা। কলেজের পড়াশোনার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মঞ্চেও তিনি মেধার স্বাক্ষর রাখেন এবং সিউলে এক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে ‘শান্তি দূত’ হিসেবে মনোনীত হন।
বলিউডে অনিল কাপুরের বিপরীতে ‘মিস্টার আজাদ’ সিনেমার মাধ্যমে অভিষেক হলেও নিকি সবচাইতে বেশি আলোচিত হন একটি ভিন্ন কারণে। মাত্র ১৯ বছর বয়সে তিনি যে সাহস দেখিয়েছিলেন, তা আজকের দিনেও বিরল। তখন তিনি শাহরুখ খানের ব্লকবাস্টার ‘ইয়েস বস’ সিনেমার জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন। কিন্তু ঠিক ওই সময়েই তাঁর পিতার আকস্মিক মৃত্যুতে পুরো পরিবার ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতির চাপে মাত্র পাঁচ দিন শুটিং করার পর তিনি সিনেমাটি ছেড়ে দেওয়ার কঠিন সিদ্ধান্ত নেন। কেবল ছবিই ছাড়েননি, নিয়ম মেনে তৎকালীন দেড় লাখ রুপি অগ্রিম পারিশ্রমিক বা ‘অ্যাডভান্স’ ফেরত দিয়ে দেন তিনি। শাহরুখের ছবি থেকে তাঁর এই প্রস্থান তখন বলিউডে আলোচনার ঝড় তুলেছিল। তবে পরিবারের পাশে দাঁড়াতে তিনি বড় পর্দা ছেড়ে টেলিভিশন বা ছোট পর্দায় কাজ শুরু করেন এবং অত্যন্ত দ্রুত জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে পরিবারের সব ঋণ শোধ করেন।
টেলিভিশনের তুঙ্গে থাকা অবস্থায় ‘ঘরওয়ালি ওপরওয়ালি’র সেটে এক ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হন নিকি। একজন জুনিয়র অভিনেতার গাড়ি তাঁকে চাপা দিলে তিনি গুরুতর আহত হয়ে এক মাস হাসপাতালে কাটান। এই এক মাসের বিরতিতে তাঁর হাতে থাকা পাঁচটি বড় প্রজেক্ট বা শো বন্ধ হয়ে যায়। সংকটের ওই মুহূর্তে বলিউড বাদশাহ শাহরুখ খান সাহায্যের হাত বাড়িয়ে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। পরবর্তীতে প্রযোজনা সংস্থার বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়েও জয়ী হন তিনি।
ব্যক্তিগত জীবনে ২০০২ সালে বিয়ে করে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান নিকি। তবে অভিনয়ের প্রতি তাঁর টান কখনোই ম্লান হয়নি। ‘আস্তিত্ব... এক প্রেম কাহিনী’ সিরিয়ালে ডা. সিমরান চরিত্রে অভিনয় করে তিনি পুনরায় ছোট পর্দায় নিজের আধিপত্য প্রমাণ করেন। মাঝে সন্তানদের লালন-পালনের জন্য কিছুটা সময় বিরতি নিলেও ২০১৭ সাল থেকে ‘দিল সামভাল যা জারা’ ও ‘পাঞ্চ বিট’-এর মতো ওয়েব সিরিজ ও নাটকের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের দর্শকদের মন জয় করে নিয়েছেন এই লড়াকু অভিনেত্রী। নিজের শর্তে জীবন চালানো এই ‘দ্বিতীয় মাধুরী’ আজও তাঁর অভিনয় আর সাহসের গল্পে অনুপ্রেরণা হয়ে আছেন।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।