মানুষের আদিম নিষ্ঠুরতা আর সামাজিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় কি তবে গ্রাস করছে আমাদের সমাজকে? বাগেরহাটের ঐতিহাসিক হজরত খানজাহান (রহ.)-এর মাজার সংলগ্ন দিঘির পাড়ে ঘটে যাওয়া এক শিউরে ওঠা ঘটনা এখন এই প্রশ্নকেই সামনে নিয়ে এসেছে। একটি অসহায় কুকুরকে কুমিরে টেনে নিয়ে যাওয়ার সময় সেটিকে উদ্ধারের চেষ্টা না করে উল্টো ‘কনটেন্ট’ তৈরির নেশায় ভিডিও ধারণে ব্যস্ত ছিলেন উপস্থিত দর্শনার্থীরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ঘটনার দৃশ্য ছড়িয়ে পড়ার পর শোবিজ অঙ্গনসহ সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় উঠেছে।
ঘটনাটি গত ৮ এপ্রিল, বুধবার বিকেলের। মাজারের দিঘির প্রধান ঘাটে তখন কুমির দেখার অপেক্ষায় ছিল বহু মানুষ। প্রত্যক্ষদর্শী ও মাজারের খাদেমদের ভাষ্যমতে, একটি অসুস্থ কুকুর ওই এলাকায় কয়েকজনকে কামড় দেওয়ার চেষ্টা করলে উপস্থিত জনতা সেটিকে তাড়া করে। একপর্যায়ে কুকুরটি মাজারের নিরাপত্তা প্রহরী ফোরকানের কাছে গেলে তিনি সেটিকে সরিয়ে দিতে পা দিয়ে ঝাড়া দেন। ঠিক তখনই কুকুরটি দিঘির পানিতে পড়ে যায় এবং মুহূর্তের মধ্যে একটি বিশাল কুমির সেটিকে কামড়ে ধরে পানির গভীরে নিয়ে যায়।
অসহায় প্রাণীটির এই করুণ পরিণতি দেখার সময় ঘাটে উপস্থিত অনেকেই মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করছিলেন। এই দৃশ্য দেখে প্রাণি অধিকার নিয়ে সর্বদা সোচ্চার দুই বাংলার জনপ্রিয় অভিনেত্রী জয়া আহসান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন এক পোস্ট শেয়ার করেন। সেখানে লেখা ছিল, “মজা করার জন্য যে তাকে নির্মমভাবে অনর্থক মরতে হবে, এটা সে বোঝেনি। বোকা কুকুর!” জয়ার এই পোস্টে সহমত পোষণ করে অভিনেত্রী দীপা খন্দকার একে ‘ভয়ানক’ বলে মন্তব্য করেছেন।
ঘটনাটি নিয়ে অভিনেতা ইরফান সাজ্জাদ তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে তাঁর ফেসবুকে লিখেছেন, “আসলে এ দেশে মানুষের চেয়ে অমানুষের সংখ্যা বেশি। দেশ খারাপ না ভাই, দেশের মানুষগুলো খুব খারাপ!” তিনি এই ধরনের অমানবিকতা রোধে সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন। গায়ক তানজীব সারোয়ারও একই সুরে বলেন, “মৃত্যুর আগপর্যন্ত ও ভেবেছিল মানুষ ওকে বাঁচাবে। কুমিরের খিদে পেলে সে খাবেই, কিন্তু মানুষের মনুষ্যত্ব কোথায়?”
জনপ্রিয় অভিনেতা নিলয় আলমগীর, যিনি ব্যক্তিগত জীবনেও কুকুরপ্রেমী হিসেবে পরিচিত, তিনি এই ঘটনায় প্রশাসনের দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে, ক্ষুব্ধ নির্মাতা অং রাখাইন জাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে প্রশ্ন তুলেছেন, “এই জাতি আগামী ১০০ বছর টিকে থাকতে পারবে কি না।”
বাগেরহাটের এই ঘটনাটি কেবল একটি প্রাণীর মৃত্যু নয়, বরং এটি আমাদের বর্তমান সময়ের ‘কনটেন্ট কালচার’ এবং মানুষের ক্রমবর্ধমান সহমর্মিতাহীনতার এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। যেখানে প্রাণের চেয়ে একটি ভাইরালিটির মূল্য বেশি হয়ে দাঁড়ায়, সেখানে মানবিকতা আর কতটুকু টিকে থাকবে—সেই প্রশ্নই এখন সর্বত্র।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।