পর্যটকদের কাছে ইউরোপ মানেই প্যারিস, লন্ডন কিংবা রোমের আভিজাত্য। কিন্তু এই পরিচিত গন্তব্যগুলোর ভিড় এড়িয়ে যদি আপনি আল্পস পর্বতমালার কোলে শান্ত, সুশৃঙ্খল এবং ছবির মতো সুন্দর কোনো জায়গার খোঁজ করেন, তবে আপনার গন্তব্য হতে পারে লিশটেনস্টাইন। ইউরোপের মানচিত্রে বুড়ো আঙুলের মতো ছোট এই দেশটির আয়তন মাত্র ৬২ বর্গমাইল। সুইজারল্যান্ড এবং অস্ট্রিয়ার মাঝখানে অবস্থিত এই ক্ষুদ্র ‘প্রিন্সিপ্যালিটি’ যেন প্রকৃতির কোলে লুকিয়ে থাকা এক মহামূল্যবান রত্ন। আয়তনে ছোট হলেও এর ঐতিহ্য, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং জীবনযাত্রার মান বিশ্বের বড় বড় দেশকেও ঈর্ষান্বিত করে।
বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই দেশটিতে কোনো নিজস্ব আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নেই। আয়তন অত্যন্ত ছোট হওয়ায় এখানে রানওয়ে নির্মাণের জায়গা বের করা বাস্তবসম্মত নয়। ফলে পর্যটকদের এখানে পৌঁছাতে হলে প্রথমে পার্শ্ববর্তী দেশ সুইজারল্যান্ড কিংবা অস্ট্রিয়ায় অবতরণ করতে হয়। সেখান থেকে সড়ক পথ কিংবা রেলপথে সীমানা পেরিয়ে প্রবেশ করতে হয় লিশটেনস্টাইনে। তবে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে যাতায়াতে পর্যটকদের কোনো ভোগান্তি পোহাতে হয় না। শুধু বিমানবন্দরই নয়, দেশটির নিজস্ব কোনো মুদ্রাও নেই। পরিবর্তে তারা ‘সুইস ফ্রাঁ’ ব্যবহার করে, যা দেশটিকে অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত স্থিতিশীল রেখেছে।
আলাদা মুদ্রানীতি না থাকলেও লিশটেনস্টাইন বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ। এর মাথাপিছু ‘জিডিপি’ (GDP) বিশ্বের বহু উন্নত দেশের চেয়েও বেশি। উচ্চপ্রযুক্তির ধাতব সামগ্রী, বিশেষ যন্ত্রাংশ এবং ডেন্টাল পণ্য উৎপাদনে দেশটি বিশ্বজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেছে। এছাড়া দেশটির ব্যাংকিং ও আর্থিক সেবা খাত আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয়।
লিশটেনস্টাইনের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা এতটাই মজবুত যে এখানে অপরাধের হার প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। অপরাধী না থাকায় অনেক সময় কারাগারের সেলগুলো বছরের পর বছর খালি পড়ে থাকে। কখনো কখনো অন্য দেশ থেকে চুক্তিতে বন্দিদের এনে কারাগার সচল রাখতে হয়। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় দেশটি বিশ্বমানের মানদণ্ড বজায় রেখেছে। রাজধানী ‘ভাডুজ’-এ পাহাড়ের চূড়ায় রাজকীয় দুর্গ দাঁড়িয়ে আছে দেশের ঐতিহ্যের প্রতীক হয়ে।
দেশটির খাদ্যাভ্যাসে প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রভাব বেশ স্পষ্ট। তাদের ঐতিহ্যবাহী খাবারের মধ্যে অন্যতম হলো ‘কাস্কনোফ্লে’, যা মূলত চিজ মেশানো নরম পাস্তার মতো একটি সুস্বাদু পদ। এছাড়া স্থানীয় সাদা ওয়াইন, বিভিন্ন ধরনের ‘সসেজ’ এবং ডেজার্ট হিসেবে ‘আপেল স্ট্রুডেল’ ও ‘চকোলেট’ বেশ জনপ্রিয়। প্রতিবছর ১৫ আগস্ট দেশটির জাতীয় দিবস বা ‘ন্যাশনাল ডে’ আড়ম্বরের সঙ্গে পালন করা হয়, যেখানে রাজপরিবার এবং সাধারণ নাগরিকরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে উৎসবে অংশ নেন। প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এই দেশটি স্বর্গরাজ্য; শীতকালে এখানে ‘স্কিইং’ এবং গ্রীষ্মে ‘হাইকিং’-এর সুযোগ পর্যটকদের বারবার টেনে নিয়ে আসে। সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের এই দেশটিতে আভিজাত্য এবং আধুনিকতার এক অপূর্ব সমন্বয় দেখা যায়।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।