বাংলার ইতিহাসের এক কালো অধ্যায় এবং দীর্ঘস্থায়ী বঞ্চনা ও নির্যাতনের প্রতীকের নাম ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’। প্রায় দুই শতাব্দী ধরে ভারতবর্ষকে শাসন ও শোষণের শৃঙ্খলে আবদ্ধ রাখা এই প্রভাবশালী ব্রিটিশ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানটি এবার ইতিহাসের পাতায় দ্বিতীয়বারের মতো দেউলিয়া হওয়ার তকমা নিয়ে কার্যক্রম বন্ধ করে দিল। দীর্ঘ ইতিহাসের পর ১৮৭০-এর দশকের পর দ্বিতীয় দফায় ২০২৫-২৬ সালে এসে এই গ্লোবাল ব্র্যান্ডটির পথচলা থেমে গেল।
১৬০০ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ রানি এলিজাবেথ-১ এর রাজকীয় সনদের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করা এই কোম্পানিটি মূলত একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও সময়ের আবর্তে তা একটি দানবীয় রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তিতে পরিণত হয়। নিজস্ব সেনাবাহিনী ও কর আদায়ের প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে তারা দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠা করেছিল। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে জয়লাভের পর বাংলার শাসনভার কুক্ষিগত করে কোম্পানিটি যে চরম শোষণ চালিয়েছিল, তার ফলশ্রুতিতে সংগঠিত হয়েছিল ভয়াবহ ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’। ওই দুর্ভিক্ষে প্রায় ৩ কোটি মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন, যা আজও বিশ্ব ইতিহাসের এক কলঙ্কিত অধ্যায় হিসেবে স্বীকৃত। নীলচাষের নামে কৃষকদের ওপর তাদের অমানুষিক নির্যাতনের স্মৃতি আজও মানুষের মনে ভীতি জাগায়।
১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের পর ১৮৫৮ সালে এই কোম্পানির প্রশাসনিক ক্ষমতা কেড়ে নেয় ব্রিটিশ সরকার। পরবর্তীতে ১৮৭৪ সালে পার্লামেন্টের মাধ্যমে এটি বিলুপ্ত করা হয়। তবে ২০০০-এর দশকে ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ ব্যবসায়ী সঞ্জীব মেহতা এই ঐতিহাসিক ব্র্যান্ডের স্বত্ব কিনে নিয়ে কোম্পানিটিকে নতুন রূপ দেন। ২০১০ সালে লন্ডনের অভিজাত মেফেয়ার এলাকার নিউ বন্ড স্ট্রিটে তিনি ২ হাজার বর্গফুটের একটি বিলাসবহুল ‘রিটেইল স্টোর’ খোলেন। যেখানে প্রিমিয়াম চা, চকলেট, কফি, মিষ্টি ও দামী মসলা বিক্রি করা হতো। এক সময়ের শোষিত অঞ্চলের একজন ব্যবসায়ীর হাতে এই কোম্পানির মালিকানা আসাকে ইতিবাচকভাবে দেখেছিলেন অনেকেই। ২০১৭ সালে মেহতা গর্ব করে বলেছিলেন, ‘একজন ভারতীয় এখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মালিক। নেতিবাচকতা এখন ইতিবাচকতায় রূপ নিয়েছে।’
কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠ দেখা গেল ২০২৫ সালের শেষভাগে এসে। গত অক্টোবর মাসে কোম্পানিটি বিশাল অঙ্কের ঋণের ভারে জর্জরিত হয়ে নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করে। বর্তমানে লন্ডনের সেই ঝলমলে শোরুমটি এখন সম্পূর্ণ জনশূন্য এবং তাদের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটটিও নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া হয়েছে।
আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, আধুনিক ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের মূল গ্রুপের কাছে ৬ লাখ পাউন্ডের বেশি (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৯.৮ কোটি টাকা) দেনার দায়ে আটকা পড়েছে। এর বাইরেও সরকারি কর বাবদ প্রায় ১ লাখ ৯৩ হাজার পাউন্ড এবং কর্মচারীদের বকেয়া বেতন বাবদ ১ লাখ ৬৩ হাজার পাউন্ড পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। সঞ্জীব মেহতার মালিকানাধীন সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোও বর্তমানে বন্ধ অথবা দেউলিয়া হওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। ফলে ইতিহাসের সেই প্রতাপশালী নামের যে পুনর্জন্ম হয়েছিল, তা এবার চরম আর্থিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে স্থায়ীভাবে সমাপ্তির পথে এগিয়ে গেল।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।