আহমেদাবাদে গম্ভীরের ‘মাস্টারক্লাস’ বনাম স্যান্টনারের ভুল চাল: ভারতের বিশ্বজয়ের ব্যবচ্ছেদ

আহমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়ামে গতকাল টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে যা হয়েছে, তাকে সহজ ভাষায় ‘একপেশে আধিপত্য’ ছাড়া আর কিছু বলা কঠিন। টসে জিতে প্রথমে ব্যাটিং করতে নেমে ভারত নির্ধারিত ২০ ওভারে ৫ উইকেটে ২৫৫ রানের যে হিমালয়সম পাহাড় গড়েছিল, তার নিচে কার্যত চাপা পড়েছে নিউজিল্যান্ড। কিউইরা ১৫৯ রানে অলআউট হওয়ায় ভারত ৯৬ রানের বিশাল ব্যবধানে জয়ী হয়ে শিরোপা পুনরুদ্ধার করেছে। তবে এই রাজকীয় জয়ের পেছনে ভারতের অদম্য পারফরম্যান্সের পাশাপাশি নিউজিল্যান্ডের বেশ কিছু কৌশলগত বা ‘ট্যাকটিক্যাল’ ভুল বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ম্যাচ পরবর্তী বিশ্লেষণে কিউই অধিনায়ক মিচেল স্যান্টনারের প্রথম ভুল হিসেবে দেখা হচ্ছে কোল ম্যাকনকিকে একাদশের বাইরে রাখা। সেমিফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকাকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার কারিগর ছিলেন এই অফ-স্পিনার। পরিসংখ্যান বলছিল, ভারতীয় ওপেনার অভিষেক শর্মা চলতি বিশ্বকাপে তিনবার অফ-স্পিনারদের প্রথম ওভারে আউট হয়েছেন। স্যান্টনার বিশেষজ্ঞ অফ-স্পিনার ম্যাকনকির বদলে খণ্ডকালীন বোলার গ্লেন ফিলিপসকে দিয়ে সেই চাল চালতে চেয়েছিলেন, যা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। উল্টো অভিষেক মাত্র ১৮ বলে বিধ্বংসী ফিফটি তুলে নিয়ে ভারতকে রকেট গতিতে এগিয়ে দেন।

বোলিং পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও স্যান্টনারের অস্থিরতা লক্ষ্য করা গেছে। প্রথম দুই ওভারে ভারত মাত্র ১২ রান তোলার পর অভিজ্ঞ ম্যাট হেনরিকে সরিয়ে হুট করেই জ্যাকব ডাফিকে আক্রমণে আনেন তিনি। পাওয়ারপ্লের ৬ ওভারের মধ্যে ৫ বার বোলার পরিবর্তন করে আক্রমণে বৈচিত্র্য আনতে চাইলেও তা বুমেরাং হয়ে দাঁড়ায়। ডাফির প্রথম ওভারেই ১৫ রান তুলে অভিষেক ও সঞ্জু স্যামসন ভারতের রানের চাকা সচল করে দেন। হেনরি যখন পঞ্চম ওভারে পুনরায় ফিরলেন, ততক্ষণে ভারত ৪ ওভারে ৫১ রান তুলে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে।

নিউজিল্যান্ডের বোলারদের ‘ওয়াইড’ বলের আধিক্যও ছিল চোখে পড়ার মতো। পাওয়ারপ্লের মধ্যেই কিউইরা ৮টি ওয়াইড বল দেয়, যার মধ্যে ৫টিই ছিল অফ-স্টাম্পের অনেক বাইরে। মূলত ভারতীয় ব্যাটারদের হাত খোলা থেকে বিরত রাখতে এই ‘ওয়াইড গ্যাম্বল’ বা কৌশল নেওয়া হলেও তা কোনো কাজে আসেনি। এছাড়া শুরুর দিকে স্লোয়ার ডেলিভারির অতিরিক্ত ব্যবহার সঞ্জু ও অভিষেকের মতো ফর্মে থাকা ব্যাটারদের কাজ আরও সহজ করে দেয়। সবচাইতে বড় জুয়া ছিল শেষ ওভারের জন্য জিমি নিশামকে বেছে নেওয়া। ফার্গুসন বা ডাফির মতো বিশেষজ্ঞ পেসার থাকা সত্ত্বেও নিশামকে ২০তম ওভার দেওয়া হলে তিনি একাই ২৪ রান বিলিয়ে দেন, যা ভারতের সংগ্রহকে আড়াইশ পার করিয়ে নিউজিল্যান্ডের ওপর পাহাড়সম মানসিক চাপ তৈরি করে।

অন্যদিকে, ভারত অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব ছিলেন রণকৌশলে অত্যন্ত প্রখর। তিনি অক্ষর প্যাটেলকে ‘প্রমোশন’ দিয়ে পাওয়ারপ্লেতেই আক্রমণে আনেন, যিনি কিউইদের দুই সেরা অস্ত্র ফিন অ্যালেন ও গ্লেন ফিলিপসকে সাজঘরে ফিরিয়ে মেরুদণ্ড ভেঙে দেন। এরপর ছিল জাসপ্রিত বুমরা নামক ‘চিট কোডের’ সঠিক ব্যবহার। পঞ্চম ওভারের সময় কোচ গৌতম গম্ভীরের ইশারা পেয়ে সূর্যকুমার বুমরাকে দিয়ে টানা দুই স্পেল করান। উদ্দেশ্য ছিল সেট হয়ে যাওয়া টিম সাইফার্টকে দ্রুত আউট করা। যদিও সাইফার্ট সে ওভারে আউট হননি, তবে বুমরার নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে নিউজিল্যান্ডের প্রয়োজনীয় রানরেট বা ‘আস্কিং রেট’ ১৪.৫৭-এ পৌঁছে যায়। মূলত গম্ভীরের আগ্রাসী মাস্টারপ্ল্যান আর সূর্যকুমারের সঠিক নেতৃত্বেই ভারত আজ বিশ্ব ক্রিকেটের সিংহাসনে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করল।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।