বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যকার সদ্য সমাপ্ত ওয়ানডে সিরিজটি মাঠের লড়াই ছাড়িয়ে এখন এক চরম আইনি ও কৌশলগত বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। তৃতীয় ও শেষ ওয়ানডেতে ১১ রানের শ্বাসরুদ্ধকর জয়ে ২-১ ব্যবধানে সিরিজ নিজেদের করে নিয়েছে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। তবে বাংলাদেশের এই গৌরবোজ্জ্বল বিজয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) ম্যাচ রেফারি নিয়ামুর রশিদের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেছে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি)। মূলত মাঠের আম্পায়ার কুমার ধর্মসেনার একটি সিদ্ধান্ত এবং বাংলাদেশের ডিআরএস (DRS) বা ‘রিভিউ’ ব্যবহারের পদ্ধতি নিয়ে দুইটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তুলেছে পাকিস্তান ম্যানেজমেন্ট।
ঘটনাটি ঘটে ম্যাচের চূড়ান্ত মুহূর্তে, যখন টানটান উত্তেজনায় কাঁপছিল গ্যালারি। জয়ের জন্য পাকিস্তানের তখন শেষ ২ বলে প্রয়োজন ছিল ১২ রান। বাংলাদেশের তরুণ স্পিনার রিশাদ হোসেনের একটি বল পাকিস্তানের ব্যাটার শাহিন শাহ আফ্রিদির লেগ স্টাম্পের বাইরে দিয়ে বেরিয়ে গেলে আম্পায়ার সেটিকে ‘ওয়াইড’ ঘোষণা করেন। তবে নাটকীয়ভাবে বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা কিছুক্ষণ নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে এলবিডব্লিউ-এর জন্য রিভিউ গ্রহণ করেন। যদিও খালি চোখে বলটি আফ্রিদির শরীরের ধারেকাছেও ছিল না, তবুও রিভিউ নেওয়ার সিদ্ধান্তে অবাক হন অনেকেই।
ইএসপিএনক্রিকইনফোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাকিস্তানের প্রথম অভিযোগ হলো—বাংলাদেশ দল মাঠের আম্পায়ারের সিদ্ধান্তের পর স্টেডিয়ামের বিশালাকার ‘বিগ স্ক্রিনে’ রিপ্লে দেখার পর রিভিউ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, কোনো প্রকার ডিজিটাল সাহায্য বা রিপ্লে দেখার আগেই রিভিউ নেওয়ার ঘোষণা দিতে হয়। পাকিস্তানের দাবি, বাংলাদেশ দল স্ক্রিন থেকে সংকেত পাওয়ার পরই এই ‘চাল’ চেলেছে। দ্বিতীয় অভিযোগটি হলো সময়ের ‘ডেডলাইন’ নিয়ে। নিয়ম অনুযায়ী ১৫ সেকেন্ডের মধ্যে রিভিউ নিতে হয়, যা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে লঙ্ঘিত হয়েছে বলে দাবি পিসিবির। তবে টেলিভিশন সম্প্রচারে কোনো নির্দিষ্ট ‘টাইমার’ না থাকায় বিষয়টি এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
ডিআরএস বা প্রযুক্তির পরীক্ষায় দেখা যায়, বলটি আফ্রিদির প্যাডে না লাগলেও ব্যাটের নিচের কোণ ছুঁয়ে গিয়েছিল। এর ফলে নিয়ম অনুযায়ী সেটি আর ‘ওয়াইড’ থাকে না। বাংলাদেশের রিভিউটি নষ্ট হলেও মাঠের আম্পায়ারের ওয়াইড দেওয়ার সিদ্ধান্তটি বাতিল হয়ে যায়। ফলে জয়ের সমীকরণ ২ বলে ১২ থেকে পাল্টে ১ বলে ১২ রানে দাঁড়িয়ে যায়, যা কার্যত পাকিস্তানের জয়ের পথ বন্ধ করে দেয়। শেষ বলে আফ্রিদি স্টাম্পড হলে বাংলাদেশের সিরিজ জয় নিশ্চিত হয়।
পাক ক্রিকেট বোর্ডের এই অভিযোগগুলো মূলত সিরিজের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনারই প্রতিফলন। উল্লেখ্য, দ্বিতীয় ওয়ানডেতে সালমান আলী আগার বিতর্কিত রানআউট এবং মাঠের মধ্যে খেলোয়াড়দের মেজাজ হারানোর ঘটনায় উভয় দলের ওপর শাস্তির খড়গ নেমে এসেছিল। সালমানকে তাঁর ‘অপেশাদার’ আচরণের জন্য ম্যাচ ফির ৫০ শতাংশ এবং বাংলাদেশের মেহেদী হাসান মিরাজকে ২০ শতাংশ জরিমানা করা হয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে পাকিস্তান ম্যানেজমেন্ট ম্যাচ রেফারির কাছ থেকে এই ভুলগুলোর একটি আনুষ্ঠানিক ও প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি দাবি করছে। মাঠের লড়াই শেষ হলেও আম্পায়ারিং এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের এই বিতর্ক এখন দুই দেশের ক্রিকেটীয় সম্পর্কে নতুন এক স্নায়ুযুদ্ধের জন্ম দিয়েছে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।