মানবেতিহাসের অন্যতম প্রাচীন ও শাশ্বত আখ্যান হলো ঘরে ফেরার আকুতি। যুদ্ধ শেষে বিধ্বস্ত এক সৈনিকের আপন আঙিনায় ফিরতে চাওয়া কিংবা দীর্ঘ প্রবাস জীবন শেষে পরিবারের সান্নিধ্য পাওয়ার সেই চিরায়ত গল্পটিই যুগে যুগে নানা রূপে শিল্প-সাহিত্যে ফিরে এসেছে। প্রায় তিন হাজার বছর আগে মহাকবি হোমার তাঁর অমর সৃষ্টি ‘দ্য অডিসি’-তে যে রোমাঞ্চকর ভ্রমণের বয়ান দিয়েছিলেন, সেই একই গল্পকে বর্তমান যুগের শ্রেষ্ঠ সিনেমাটিক ‘প্যাকেজ’ হিসেবে বড় পর্দায় হাজির করেছেন অস্কারজয়ী নির্মাতা ক্রিস্টোফার নোলান। তবে নোলানের এই নির্মাণ কেবল হোমারের পুনর্কথন নয়, বরং এটি এক ক্লান্তিহীন মানুষের আত্মিক অনুসন্ধানের এক অনন্য দলিল।
নোলানের ‘দ্য অডিসি’ বিশ্বজুড়ে মুক্তির পরপরই বক্স অফিসে আক্ষরিক অর্থেই এক প্রলয়ংকরী ঝড় তুলেছে। মাত্র কয়েক দিনেই এই চলচ্চিত্রটি বিশ্বব্যাপী ৩৯০ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা আয় করে নতুন রেকর্ডের জন্ম দিয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাগৃহগুলোতেও এই সিনেমাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে অভূতপূর্ব উন্মাদনা। রাজধানীতে প্রতিদিন ৫০টিরও বেশি শো প্রদর্শিত হচ্ছে এবং মাত্র এক সপ্তাহেই এটি প্রায় দুই কোটি টাকা আয়ের মাইলফলক স্পর্শ করেছে। মূলত দর্শকরা নোলানের সেই চিরচেনা মনস্তাত্ত্বিক মারপ্যাঁচ আর মহাকাব্যিক দৃশ্যায়নের মিশেলে মুগ্ধ হয়ে বুঁদ হয়ে থাকছেন সিনেমা হলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে।
হোমারের মূল মহাকাব্যে ওডেসিয়াসকে যেখানে এক অজেয় এবং আত্মবিশ্বাসী বীর হিসেবে দেখা যায়, নোলানের লেন্সে তিনি সেখানে অনেক বেশি রক্ত-মাংসের মানুষ। ম্যাট ডেমন এই চরিত্রে এমন এক অসাধারণ অভিনয় করেছেন, যেখানে তাঁর চোখের কোণায় দীর্ঘ যুদ্ধের ক্লান্তি, অনুতাপ আর মানবিক দুর্বলতাগুলো স্পষ্ট ধরা পড়ে। ট্রোজান যুদ্ধ শেষ হওয়ার আট বছর পরেও যখন ইথাকার রাজা ওডেসিয়াস ফিরতে পারছেন না, তখন তাঁর স্ত্রী পেনেলোপে (অ্যান হ্যাথাওয়ে) দীর্ঘ ১৮ বছরের ধৈর্য নিয়ে স্বামীর জন্য প্রহর গুনছেন। এই দীর্ঘ বিরহে বড় হয়ে ওঠা ছেলে তেলেমাকাস (টম হল্যান্ড) তাঁর পিতাকে ছাড়াই এক অনিশ্চিত শৈশব পার করেছে। নোলান এখানে যুদ্ধের চেয়েও অপেক্ষার যন্ত্রণা এবং স্মৃতি হারিয়ে ফেলা এক মানুষের ঘরমুখী যাত্রাকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন।
পুরো সিনেমাটি দেখতে দেখতে মনে হয়, নোলান যেন তাঁর গত দুই দশকের ক্যারিয়ারের সব অভিজ্ঞতার এক ‘স্মার্ট’ সংকলন এখানে পেশ করেছেন। সমুদ্রতীরে স্মৃতির সাথে লড়াই করা সেই ‘ইনসেপশন’ বা ‘মেমেন্টো’র ছায়া যেমন এখানে আছে, তেমনি আছে ‘ডানকার্ক’ এর যুদ্ধ আর ‘ইন্টারস্টেলার’ এর মানবিক প্রতারণার সূক্ষ্ম কারুকাজ। একচোখা সাইক্লোপস থেকে শুরু করে জাদুকরী সার্সি (সামান্থা মর্টন) কিংবা মোহনীয় ক্যালিপসোর (শার্লিজ থেরন) মতো পৌরাণিক চরিত্রগুলো নোলানের হাতে এক নতুন জীবন পেয়েছে। বিশেষ করে জেনডায়ার অভিনীত দেবী অ্যাথেনা চরিত্রটি গল্পের প্রতিটি মোড়ে এক রহস্যময় আবহ তৈরি করেছে।
সিনেমাটির কারিগরি মুন্সিয়ানা আর সংলাপের গভীরতা দর্শকদের এতটাই নাড়িয়ে দিয়েছে যে, এটি কেবল একটি ঐতিহাসিক ছবি হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সার্সি যখন মানুষের আসল রূপ প্রকাশ করার কথা বলেন, তখন তা আধুনিক সমাজের ভণ্ডামির ওপর এক কড়া চপেটাঘাত হিসেবে আবির্ভূত হয়। সব মিলিয়ে ক্রিস্টোফার নোলান আরও একবার প্রমাণ করলেন যে, সঠিক ‘বাজেট’ আর সৃজনশীল প্রজ্ঞার মেলবন্ধন ঘটলে তিন হাজার বছরের পুরনো গল্পকেও একবিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ ‘ব্লকবাস্টার’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। ঘরে ফেরার এই দীর্ঘ ও বিপদসংকুল যাত্রাটি শেষ পর্যন্ত কেবল ইথাকায় নয়, বরং দর্শকের হৃদয়ের গভীরে পৌঁছে গিয়েছে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।