দেশের চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। সংকট থেকে দ্রুত উত্তরণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় উৎস থেকে গ্যাস-তেল অনুসন্ধান, এলএনজি আমদানি ও টার্মিনাল স্থাপন, কয়লার সরবরাহ বাড়ানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জোর দেওয়া হচ্ছে। পুরো পরিকল্পনার অগ্রগতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেই মনিটরিং করছেন বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বর্তমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের পেছনে দীর্ঘদিনের গ্যাস অনুসন্ধানের ঘাটতি, আমদানিনির্ভরতা, বিদ্যুৎ খাতের অপরিকল্পিত সম্প্রসারণ এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব রয়েছে। এর সঙ্গে একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বিকল হওয়ায় সংকট আরও তীব্র হয়েছে। সরকারের নীতিনির্ধারকদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে দেশীয় উৎসে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে পর্যাপ্ত কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়ায় আমদানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।
সরকারের রোডম্যাপ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খনন করে গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই সময়ে তিনটি এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ রয়েছে। বর্তমানে দেশে দৈনিক প্রায় ২৩০ থেকে ২৬০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হলেও তা বাড়িয়ে ৫০০ কোটি ঘনফুটে নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ১০ সেপ্টেম্বর সংসদে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত নিয়ে সরকারের ১০ বছরের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে জনগণের ভোগান্তির বিষয়ে সরকার সম্পূর্ণ সচেতন। একই সঙ্গে বিরোধী দলকে সঙ্গে নিয়ে জ্বালানি সংকট মোকাবিলার কথাও জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমান সংকট হঠাৎ তৈরি হয়নি; দীর্ঘদিনের ভুলনীতি ও অনিয়মের ফল হিসেবে এর সৃষ্টি হয়েছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর
বিদ্যুৎ খাতেও বড় ধরনের পরিবর্তনের পরিকল্পনা করছে সরকার। নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এ জন্য মার্চেন্ট পাওয়ারের আওতায় বিশেষ প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে।
এই প্যাকেজের আওতায় উদ্যোক্তারা ব্যাটারিসহ সোলার প্যানেল স্থাপন করে সরকারের বিতরণ কোম্পানির কাছে প্রতি ইউনিট সাড়ে ১০ টাকা দরে বিদ্যুৎ বিক্রি করতে পারবেন। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এ উদ্যোগের ফলে নেট মিটারিং ব্যবস্থার মাধ্যমে বিভিন্ন খাত থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রস্তাব আসতে পারে।
পাশাপাশি পায়রা, মাতারবাড়ী ও বড়পুকুরিয়ায় কয়লাভিত্তিক তিনটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে। এসব কেন্দ্র থেকে ২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পায়রা ও মাতারবাড়ীতে জমি প্রস্তুত রয়েছে। এখন কেন্দ্রগুলো কোন পদ্ধতিতে স্থাপন করা হবে, তা নিয়ে পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
লোডশেডিং কমাতে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকেও অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহে ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে ২০৩০ সালের মধ্যে গ্রিড লাইনের সক্ষমতা বাড়ানোর বিভিন্ন পরিকল্পনা রয়েছে।
গ্যাস উৎপাদনে ১৫০ কূপ, বাড়বে এলএনজি সরবরাহ
সরকারের জ্বালানি পরিকল্পনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর ওপর। ২০৩০ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খনন করে ১৭৬ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এর পাশাপাশি আগামী ১০ বছরে আরও চার থেকে পাঁচটি এফএসআরইউ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে দুটি ভাসমান টার্মিনাল স্থাপন করে দৈনিক ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে। মাতারবাড়ীতে একটি ল্যান্ড বেইজড এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন করে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক আরও ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
সব উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে বর্তমান সরকারের মেয়াদে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ ৫০০ কোটি ঘনফুটে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। স্থানীয় উৎসে অনুসন্ধানের পাশাপাশি আমদানিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য ব্লক বরাদ্দে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে, যার শেষ সময় আগামী নভেম্বর। এর বাইরে বিদেশি কোম্পানির মাধ্যমে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আরও আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের প্রস্তুতি চলছে।
প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহই বড় চ্যালেঞ্জ
সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে প্রাথমিক জ্বালানি—তেল, গ্যাস ও কয়লার সরবরাহ নিশ্চিত করা। কারণ এসব জ্বালানি ছাড়া বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্প-কারখানা, পরিবহণ ও রান্নাসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ কোনো খাতই স্বাভাবিকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয়।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে গ্যাসের দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। এর বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ২৬০ কোটি ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়ে এই সরবরাহের মধ্যে ১০০ কোটি ঘনফুটের বেশি গ্যাস আমদানি করে জাতীয় গ্রিডে দেওয়া হয়।
জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রেও আমদানিনির্ভরতা বেশি। দেশে বছরে প্রায় ৭০ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে, যার ৮০ শতাংশের বেশি আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। কয়লার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের নির্ভরতা রয়েছে। দেশে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে প্রায় ৬ হাজার মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। এসব কেন্দ্রে বছরে প্রায় দেড় কোটি টন কয়লা প্রয়োজন হয়, যার শতভাগ ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানি করা হচ্ছে।
তেল ও এলপিজি মজুত বাড়ানোর উদ্যোগ
তেলের মজুত ৯০ দিনে উন্নীত করার জন্য বিভিন্ন প্রকল্প ও কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ৩২ দিনের তেলের মজুত রয়েছে, যা আগে ছিল মাত্র ১৭ দিনের।
এ ছাড়া প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ইস্টার্ন রিফাইনারি-২ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এ প্রকল্পের জন্য ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সঙ্গে ১০০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তিও হয়েছে।
গরিব পরিবারগুলোর জন্য ভর্তুকি মূল্যে প্রতি মাসে এলপিজি সরবরাহের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে বিপিসিকে প্রতি মাসে ৯০ হাজার টনের বেশি এলপিজি আমদানির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মহেশখালী, কাট্টলী, মাতারবাড়ী, মোংলা ও অ্যালেঙ্গায় এলপিজি ডিপো স্থাপনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বাড়িয়েছে সংকট
গত সাত মাসে জ্বালানি খাতে একাধিক বড় সংকট মোকাবিলা করতে হয়েছে সরকারকে। ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়ে। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি জ্বালানি আমদানির ব্যয়ও বাড়িয়েছে।
সরকারি কর্মকর্তাদের হিসাবে, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বেশি দামে তেল কিনে কম দামে বিক্রি করতে গিয়ে সরকারের এখন পর্যন্ত ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম সোমবার ১০৭ ডলারে পৌঁছেছে। ফলে সামনে তেল আমদানিতে সরকারের ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে বেশি দামে এলএনজি কিনে কম দামে বিক্রি করায় এ খাতে সরকারকে এখন পর্যন্ত ১৫ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়েছে।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান বলেছেন, জ্বালানি খাতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রাথমিক জ্বালানি তেল, গ্যাস ও কয়লার সরবরাহ বাড়াতে পরিকল্পিতভাবে কাজ করা হচ্ছে।
ক্যাপাসিটি চার্জের চাপ
বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান সংকটের পেছনে অতীতে যাচাই-বাছাই ছাড়া বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের অনুমোদন দেওয়ার বিষয়টিও সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, অনেক কেন্দ্র স্থাপনের পর পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে কেন্দ্রগুলো থেকে প্রত্যাশিত উৎপাদন না পেলেও ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হচ্ছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ ২ লাখ ৮১ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ আরও জানিয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সৌরবিদ্যুতের ৩৭টি প্রকল্পের সম্মতিপত্র বা এলওআই বাতিল করা হয়েছিল, যা বিদ্যুৎ খাতের জন্য ক্ষতিকর হয়েছে বলে সরকার মনে করছে।
সব মিলিয়ে সরকার এখন স্থানীয়ভাবে গ্যাস ও তেল অনুসন্ধান, এলএনজি আমদানি ও টার্মিনাল সম্প্রসারণ, কয়লার সরবরাহ নিশ্চিতকরণ, নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালন সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দ্রুত সিদ্ধান্ত, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন বড় পরীক্ষা।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।