২০১৮-র সেই আলোচিত ৩২ ডিসির বাধ্যতামূলক অবসর: প্রশাসনে বড় রদবদলের নেপথ্যে কী?

বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোয় এক নজিরবিহীন ও বড় ধরণের শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করেছে বর্তমান সরকার। ২০১৮ সালের বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জেলা পর্যায়ে ‘রিটার্নিং কর্মকর্তা’র দায়িত্ব পালন করা তৎকালীন ৩২ জন জেলা প্রশাসককে (ডিসি) বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। সোমবার (২৭ জুলাই) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা পৃথক পৃথক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি জনসমক্ষে আনা হয়। মূলত সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৪৫ ধারা অনুযায়ী ‘জনস্বার্থে’ এই কর্মকর্তাদের চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

প্রজ্ঞাপনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের চাকরির মেয়াদ ইতিপূর্বেই ২৫ বছর পূর্ণ হয়েছে এবং সরকার আইনগতভাবে তাঁদের অবসরে পাঠানোর এখতিয়ার রাখে। দীর্ঘদিন ধরে এই কর্মকর্তারা সচিবালয়ে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা ‘ওএসডি’ (OSD) হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। যদিও তাঁরা বিধি অনুযায়ী অবসরকালীন সব ধরণের সুযোগ-সুবিধা ও ‘প্যাকেজ’ পাবেন, তবে এই আদেশটি অবিলম্বে এবং তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বাধ্যতামূলক অবসরে যাওয়া এই ৩২ কর্মকর্তার তালিকায় রয়েছেন দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জেলার প্রাক্তন ডিসিরা। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন— রাজশাহীর এস এম আব্দুল কাদের, মাগুরার মো. আলী আকবর, হবিগঞ্জের মাহমুদুল কবীর মুরাদ, মানিকগঞ্জের এস এম ফেরদৌস, কিশোরগঞ্জের মো. সারওয়ার মুর্শেদ চৌধুরী, নরসিংদীর সৈয়দা ফারহানা কাউনাইন, খুলনার মোহাম্মদ হেলাল হোসেন এবং শেরপুরের আনার কলি মাহবুব। এছাড়াও এই তালিকায় কুড়িগ্রামের সুলতানা পারভীন, নীলফামারীর নাজিয়া শিরিন, পটুয়াখালীর মো. মতিউল ইসলাম চৌধুরী, চুয়াডাঙ্গার গোপাল চন্দ্র দাস, ভোলার মোহাম্মদ মাসুদ আলম ছিদ্দিক, বরিশালের এস এম অজিয়র রহমান, ফেনীর মো. ওয়াহেদুজ্জামান এবং খাগড়াছড়ির মো. সাহেদুল ইসলামের নাম রয়েছে।

তালিকায় থাকা অন্যান্য কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন ঝিনাইদহের সরোজ কুমার নাথ, পাবনার মো. জসিম উদ্দিন, সুনামগঞ্জের মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ, কক্সবাজারের মো. কামাল হোসেন, রাঙ্গামাটির এ কে এম মামুনুর রশিদ, লক্ষ্মীপুরের অঞ্জন চন্দ্র পাল, চট্টগ্রামের মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন, নওগাঁর মো. মিজানুর রহমান, চাঁপাইনবাবগঞ্জের এ জেড এম নূরুল হক, শরীয়তপুরের কাজী আবু তাহের, নাটোরের মো. শাহরিয়ার, বান্দরবানের মো. দাউদুল ইসলাম, নেত্রকোনার মঈনউল ইসলাম, কুষ্টিয়ার মো. আসলাম হোসেন, কুমিল্লার মো. আবুল ফজল মীর এবং চাঁদপুরের মো. মাজেদুর রহমান খান।

সরকারি একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, এই সিদ্ধান্তটি মূলত দীর্ঘমেয়াদী প্রশাসনিক সংস্কার এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনের সময়কার কর্মকর্তাদের বিতর্কিত ভূমিকা পর্যালোচনার অংশ। উল্লেখ্য, ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সেই নির্বাচনে ‘আগের রাতে ব্যালট বাক্স ভর্তি’ এবং ভোটারদের বাধা দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছিল, যা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও ব্যাপক সমালোচনা হয়। বর্তমান সরকার ‘ক্লিন ইমেজ’ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রশাসনের উচ্চস্তরে থাকা এই ‘রিটার্নিং কর্মকর্তা’দের বিরুদ্ধে এমন কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করল বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের এই যুগে মুহূর্তেই খবরটি ছড়িয়ে পড়লে প্রশাসনের অন্দরমহলে এক ধরণের মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।