দেশের অন্যতম প্রধান অন্নভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলে বোরো ফসলের নিরাপত্তা এখন চরম ঝুঁকির মুখে। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারের জন্য নির্ধারিত ‘ডেডলাইন’ বা সময়সীমা পার হয়ে গেলেও অনেক স্থানে কাজ এখনো সমাপ্ত হয়নি। বাঁধের নির্মাণকাজে এই ধীরগতি এবং মাটির স্থায়িত্ব নিয়ে হাওরপাড়ের হাজার হাজার কৃষকের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ও দুশ্চিন্তা দেখা দিয়েছে। দেরিতে কাজ শুরু হওয়ায় বৃষ্টির মৌসুমে এই কাঁচা মাটি কতটুকু সুরক্ষা দিতে পারবে, তা নিয়েই এখন বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
চলতি মৌসুমে নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলে মোট ১৩৭ দশমিক ৫৭৯ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ডুবন্ত বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞের জন্য মোট ‘বাজেট’ ধরা হয়েছে ৩১ কোটি টাকা, যার মধ্যে প্রাথমিক পর্যায়ে ১১ কোটি ২৮ লাখ টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। পুরো জেলাজুড়ে গঠিত ২০২টি পিআইসি (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি)-এর মাধ্যমে এই কাজ পরিচালিত হচ্ছে। এর মধ্যে খালিয়াজুরিতে ১৪৪টি, মোহনগঞ্জে ২৯টি, মদনে ১৯টি এবং কলমাকান্দায় ১০টি প্রকল্প রয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)-এর কঠোর নীতিমালা অনুযায়ী, হাওরের এই ফসলরক্ষা বাঁধের কাজ ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে শুরু হয়ে ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে পুরোপুরি শেষ করার কথা। কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। অনেক স্থানে ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে এসেও কেবল মাটির কাজ শুরু হতে দেখা গেছে। কৃষকদের আশঙ্কা, দেরিতে মাটি ফেলার কারণে তা বসার পর্যাপ্ত সময় পাবে না। ফলে বর্ষার শুরুতেই আগাম পাহাড়ি ঢল বা প্রবল বৃষ্টিতে এই নরম মাটি ধসে গিয়ে হাওরের সোনালী ফসল তলিয়ে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।
নেত্রকোনা জেলা পাউবোর অধীনে প্রায় ৩৬৫ কিলোমিটার অস্থায়ী ডুবন্ত বাঁধ রয়েছে, যা সরাসরি প্রায় ৪৩ হাজার হেক্টর জমির বোরো ফসলকে সুরক্ষা দেয়। এই ফসলের ওপরই নির্ভর করে এই অঞ্চলের প্রান্তিক কৃষকদের সারা বছরের জীবন-জীবিকা, চিকিৎসা ব্যয় এবং সন্তানদের পড়াশোনার খরচ। খালিয়াজুরির জগন্নাথপুর এলাকার কৃষক ওয়াসিম মিয়া উদ্বেগের সুরে বলেন, “বাঁধের কাজ এখনো শেষ হয়নি। ধনুসহ বিভিন্ন নদ-নদী পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়ায় এখন সামান্য পানিতেই বন্যা হয়ে যায়। বছরের একমাত্র ফসল নিয়ে আমরা এখন বড় অনিশ্চয়তায় আছি।”
তবে প্রকল্পের তদারকির দায়িত্বে থাকা সরকারি কর্মকর্তাদের দাবি, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। জেলা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন জানান, হাওরের পানি দেরিতে নামায় এবং বিশেষ করে খালিয়াজুরির ধনু নদ ভরাট হয়ে থাকায় জরিপ বা ‘সার্ভে’ শেষ করতে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। এছাড়া নির্দিষ্ট স্থানে সহজে মাটি না পাওয়ায় কিছু প্রকল্প পিছিয়ে গেছে। খালিয়াজুরি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাদির হোসেন বলেন, “কাজের গড় অগ্রগতি প্রায় ৯০ শতাংশ। আশা করছি আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে মাটির কাজ শেষ হবে এবং এরপর স্লোভ (ঢাল) ঠিক করা ও ঘাস লাগানোর কাজ সম্পন্ন করা হবে।”
নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমানও বাঁধের কাজের বর্তমান অবস্থা তদারকি করছেন। তিনি জানান, ৯০ শতাংশ কাজ ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং বাকি কাজ দ্রুততম সময়ের মধ্যে শেষ করতে সংশ্লিষ্ট পিআইসিগুলোকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। হাওর অঞ্চলের মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় কোনো ধরনের অবহেলা সহ্য করা হবে না বলেও তিনি হুঁশিয়ারি দেন। এখন দেখার বিষয়, প্রকৃতির রুদ্ররূপ ধারণের আগেই এই কৃত্রিম প্রতিরক্ষা প্রাচীর কত দ্রুত নিশ্ছিদ্র করা সম্ভব হয়।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।