বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ রুট হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা এখন চরমে। মার্কিন নৌ-অবরোধের পাল্টা জবাব দিতে এবার হরমুজ প্রণালির বাইরে একটি নতুন ‘বহির্ভূত অঞ্চল’ বা ‘এক্সক্লুশন জোন’ (Exclusion Zone) ঘোষণা করার পরিকল্পনা করছে ইরান। দেশটির সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের নবনিযুক্ত প্রধান মোহসেন রেজাই এই হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন, যেসব জাহাজকে তেহরান সন্দেহজনক মনে করবে, সেগুলোকে এই নতুন ঘোষিত অঞ্চলের আওতায় এনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রবিবার ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মোহসেন রেজাই এই কঠোর অবস্থানের কথা জানান। তিনি বলেন, আগামী কয়েক দিন বা সপ্তাহের মধ্যে এই নতুন অঞ্চলটির সীমানা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হতে পারে। প্রস্তাবিত এই এলাকাটি মার্কিন নৌ-অবরোধের সীমারেখা থেকে শুরু হয়ে হরমুজ প্রণালির প্রবেশমুখ এবং অন্য প্রান্তে আরব উপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত থাকবে। কোনো জাহাজ যদি এই এলাকা দিয়ে হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টা করে এবং সেটি যদি ইরানের নিরাপত্তা বা বাণিজ্যিক স্বার্থের পরিপন্থী হয়, তবে সংশ্লিষ্ট জাহাজটিকে ইরানের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানের এই পদক্ষেপ মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক সপ্তাহব্যাপী চলমান নৌ-অবরোধের একটি সরাসরি পাল্টা জবাব। ট্রাম্প প্রশাসন ইরানি বন্দরগুলো লক্ষ্য করে এই অবরোধ আরোপ করেছে, যার মূল উদ্দেশ্য তেহরানের তেল রপ্তানি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া। মার্কিন সামরিক বাহিনীর তথ্যমতে, বর্তমানে ২০টিরও বেশি যুদ্ধজাহাজ এই অবরোধে সক্রিয় রয়েছে। এর ফলে ইতিমধ্যে ৯২টি বাণিজ্যিক জাহাজকে তাদের নির্ধারিত পথ পরিবর্তন করতে হয়েছে এবং তিনটি জাহাজ অচল হয়ে পড়েছে। তবে ইরান কীভাবে মার্কিন অবরোধের সুনির্দিষ্ট সীমারেখা নির্ধারণ করছে, তা নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা রয়েছে।
এদিকে, রণক্ষেত্রেও উত্তাপ বাড়ছে। ইরান দাবি করেছে যে, তারা হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশের চেষ্টাকালে একটি চালকবিহীন মার্কিন নৌযানে হামলা চালিয়েছে। তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী এই দাবিকে ‘সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন’ ও ‘মিথ্যা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে। এক মাসের আপেক্ষিক শান্তির পর গত সপ্তাহ থেকে দুই দেশের মধ্যে নতুন করে হামলা-পাল্টা হামলা শুরু হয়েছে। সপ্তাহের শুরুতে মার্কিন বোমাবর্ষণে ইরানের দক্ষিণ উপকূলে অন্তত পাঁচজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে, যা ওই অঞ্চলের পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলেছে।
কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও আস্থার সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে। গত জুনে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক ভেঙে যাওয়ার পর ইরান এখন মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর ওপরও আস্থা হারিয়েছে। রেজাই জানান, পাকিস্তান, কাতার ও ওমানের মতো দেশগুলোর মধ্যস্থতায় তারা বিশ্বাস করেছিলেন, কিন্তু চুক্তি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে এসব দেশ কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। ফলে ইরান এখন নিজস্ব ‘নিশ্চয়তা’ ও কঠোর সামরিক শক্তির ওপর ভিত্তি করেই এগোচ্ছে।
অন্যদিকে, জ্বালানি তেলের বিশ্ববাজার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট জানিয়েছেন, সংঘাত সত্ত্বেও প্রতিদিন গড়ে ৯০ লাখ ব্যারেল তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হচ্ছে। তবে ট্যাংকার ট্র্যাকার্স ডটকমের মতো নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলো বলছে, প্রকৃত তেলের প্রবাহ রাইটের দেওয়া হিসাবের চেয়ে অনেক কম। ইরান অবশ্য দাবি করেছে যে, সব বাধা সত্ত্বেও তারা প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি অব্যাহত রেখেছে।
সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালি এখন এক বিশাল যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হওয়ার শঙ্কায় রয়েছে। একদিকে মার্কিন অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ, অন্যদিকে ইরানের নতুন কট্টরপন্থী নেতৃত্বের আপসহীন অবস্থান—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পড়ে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।