প্রযুক্তি বিশ্বে গত এক দশক ধরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল স্মার্টওয়াচের মাধ্যমে রক্তে শর্করার মাত্রা বা গ্লুকোজ মনিটরিং করার বিষয়টি। টেক জায়ান্ট অ্যাপল দীর্ঘ সময় ধরে এ ধরনের ফিচারের আশ্বাস দিলেও বাস্তবে তা এখনো আলোর মুখ দেখেনি। একই পথে হেঁটেছে স্যামসাং বা গারমিনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো; অগণিত পেটেন্ট বা স্বত্ব হাতে থাকলেও সাধারণ গ্রাহকদের জন্য কার্যকর কোনো ডিভাইস তারা বাজারে আনতে ব্যর্থ হয়েছে। তবে দীর্ঘদিনের সেই স্থবিরতা ভেঙে স্বাস্থ্য প্রযুক্তিতে এক নতুন বিপ্লব নিয়ে এলো চীনা প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ে।
সম্প্রতি দুবাইয়ে আয়োজিত এক জমকালো অনুষ্ঠানে হুয়াওয়ে তাদের নতুন সংস্করণ ‘ওয়াচ জিটি ৬ প্রো’ (Watch GT 6 Pro) উন্মোচন করেছে। প্রতিষ্ঠানটি দাবি করছে, এই স্মার্টওয়াচটি কেবল ব্যবহারকারীর দৈনন্দিন হাঁটার গতি বা হৃদস্পন্দন পরিমাপেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং রক্তে শর্করার মারাত্মক ঝুঁকি সম্পর্কে আগেভাগেই ব্যবহারকারীকে সতর্ক করতে সক্ষম হবে।
প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে ‘নন-ইনভেসিভ’ বা সুঁইবিহীন গ্লুকোজ মনিটরিং নিয়ে অনেক বড় বড় কথা শোনা গেলেও বাস্তব প্রয়োগ ছিল নামমাত্র। হুয়াওয়ে এখানে সরাসরি শর্করার মাত্রা পরিমাপ না করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও উন্নত সেন্সরের মাধ্যমে শরীরের বিভিন্ন সূচক বিশ্লেষণ করে ডায়াবেটিসের প্রাথমিক ঝুঁকি শনাক্ত করার পদ্ধতি বেছে নিয়েছে।
অনেকের মনেই কৌতূহল জাগতে পারে, চামড়া ছিদ্র না করে বা কোনো রক্ত পরীক্ষা ছাড়াই এই ঘড়ি কীভাবে শর্করার হদিস পায়? এর নেপথ্যে রয়েছে হুয়াওয়ের উন্নত ‘ফটোপ্লেথিসমোগ্রাফি’ বা পিপিজি (PPG) প্রযুক্তি। এটি মূলত একটি লাইট-বেজড সেন্সর, যা সাধারণত হৃদস্পন্দন বা রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা মাপে। তবে হুয়াওয়ের আসল উদ্ভাবন লুকিয়ে আছে এর শক্তিশালী সফটওয়্যার ও বিশেষ অ্যালগরিদমে।
এই স্মার্টওয়াচটি টানা ৩ থেকে ১৪ দিন ব্যবহারকারীর শরীরে পিপিজি সিগন্যালের সূক্ষ্ম পরিবর্তনগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে। কোনো তাৎক্ষণিক রিডিং দেওয়ার পরিবর্তে এটি দীর্ঘ কয়েক দিনের ডেটা সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে। মূলত রক্তপ্রবাহের তরঙ্গ বা ‘ওয়েভফর্ম’ বিশ্লেষণ করে এটি মানুষের বিপাকীয় বা মেটাবলিক সমস্যার ধরন খুঁজে বের করে। বিশ্লেষণ শেষে ব্যবহারকারীকে তিনটি স্তরে ফলাফল জানানো হয় স্বল্প ঝুঁকি, মাঝারি ঝুঁকি এবং উচ্চ ঝুঁকি।
এই উদ্ভাবনী প্রযুক্তির কার্যকারিতা যাচাইয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ের মোহাম্মদ বিন রশিদ ইউনিভার্সিটির অ্যান্ডোক্রাইনোলজি ও ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ ড. মারিয়াম আল সাইদ। দুবাই হেলথ ফ্যাসিলিটিজের অধীনে বর্তমানে প্রায় ১৫০ জন স্বেচ্ছাসেবীর ওপর এই প্রযুক্তির ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চালানো হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান বিশ্বে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত প্রায় ৪৩ শতাংশ মানুষই জানেন না যে তাদের শরীরে এই রোগটি বাসা বেঁধেছে। এই বিশাল সংখ্যক ‘আনডায়াগনোজড’ রোগীদের জন্য হুয়াওয়ের এই আগাম সতর্কবার্তা আক্ষরিক অর্থেই জীবন রক্ষাকারী ঢাল হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এটি শুধু একটি গ্যাজেট নয়, বরং আগামীর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এক অনন্য মাইলফলক।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।