সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ ও পলাতক মন্ত্রীদের সঙ্গে গোপন আঁতাত? সাবেক ২ সেনা কর্মকর্তার রিমান্ডে বিস্ফোরক তথ্য!

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারবিরোধী উসকানিমূলক প্রচারণা, নিষিদ্ধ সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনা এবং সাবেক সেনাপ্রধানসহ পলাতক শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে আঁতাত করে রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া সাবেক দুই সেনা কর্মকর্তাকে চার দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সোমবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট দিদারুল আলম শুনানি শেষে এই আদেশ প্রদান করেন।

এর আগে রোববার দিবাগত রাত ১২টা থেকে ৩টা পর্যন্ত রাজধানীর পল্লবী ও বনানী ডিওএইচএস এলাকায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে ওই দুই কর্মকর্তাকে গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ। গ্রেফতারকৃতরা হলেন—অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল দেবাশীষ কুমার বড়ুয়া (৪৭) এবং লেফটেন্যান্ট কাজী গুলশান আরা (৪৩)।

আদালতে পেশ করা পুলিশের রিমান্ড আবেদনে এই দুই সাবেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অত্যন্ত গুরুতর ও স্পর্শকাতর অভিযোগের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। আবেদনে উল্লেখ করা হয়, গ্রেফতারকৃতরা এবং তাঁদের সহযোগীরা নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনা, সংগঠনের জন্য তহবিল সংগ্রহ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক নানা ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি ও প্রচারের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আসামিরা বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও ফেসবুক পেজকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে সরকারবিরোধী বিদ্বেষপূর্ণ অপপ্রচার চালিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করার চক্রান্ত করে আসছিলেন।

রিমান্ড আবেদনে আরও বিস্ফোরক তথ্য তুলে ধরে পুলিশ জানায়, অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মকে কাজে লাগিয়ে আসামিরা সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদ, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং বিভিন্ন মামলার পলাতক শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত গোপন যোগাযোগ রক্ষা করছিলেন। এই যোগাযোগের মূল উদ্দেশ্য ছিল আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনর্বাসন এবং সুদূরপ্রসারী রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করা। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা নথিতে উল্লেখ করেন, আসামিরা ২০২৪-এর ৫ আগস্টের পর থেকে ২০২৬ সালের ১১ অক্টোবর পর্যন্ত তাঁদের সহযোগীদের নিয়ে বর্তমান সরকার ও বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ক্রমাগত ষড়যন্ত্র এবং কুৎসামূলক প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

এছাড়া আসামিদের সঙ্গে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গুপ্তচর সংস্থার যোগাযোগের অভিযোগের বিষয়টিও জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে আবেদনে জানায় পুলিশ। ঘটনার সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য পলাতক আসামিদের শনাক্তকরণ, ব্যবহৃত ডিজিটাল আলামত উদ্ধার, পরিচালিত বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজের তথ্য সংগ্রহ এবং ষড়যন্ত্রের মূল রহস্য উদঘাটনের লক্ষ্যে আদালতে সাত দিনের পুলিশ রিমান্ড প্রার্থনা করা হয়। শুনানি শেষে বিচারক চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

আদালতে রিমান্ড শুনানিকালে দেবাশীষ কুমার বড়ুয়ার পক্ষে আইনজীবী অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল মনসুর রিপন রিমান্ড বাতিল ও জামিনের আবেদন জানিয়ে বলেন, "দেশে দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টি হয়, দেশ ডেসট্রো হয় এমন একটা শব্দ তার বিরুদ্ধে নেই। তিনি কি ঘটনাস্থলে ছিলেন, সেখানে থেকে জেনে-শুনে দেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য সন্ত্রাসী কাজ করার কিছু করেছেন? রিমান্ড বাতিল করে তার জামিন প্রার্থনা করছি।"

অপর আসামি গুলশান আরার পক্ষে রিমান্ড বাতিলের যুক্তি তুলে ধরে অ্যাডভোকেট মশিউর রহমান বলেন, "তার মক্কেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ, আর্মি অফিসারদের সঙ্গে যোগাযোগ। এটা তো থাকতেই পারে। কারণ তিনি সেনাবাহিনীতে চাকরি করেছেন। এটা তো দোষের কিছু নয়। ফেসবুক পেজ খোলা, কনটেন্ট তৈরি করা কোনো অপরাধ নয়।"

এর বিপরীতে রাষ্ট্রপক্ষে প্রসিকিউটর হারুন-অর-রশীদ রিমান্ডের যৌক্তিকতা তুলে ধরে শুনানিতে জোর দিয়ে বলেন, "দুই আসামি সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদ, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করছে। আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসিত করতে তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে। দেশি-বিদেশি গুপ্তচরদের সঙ্গে যোগাযোগ, অভ্যন্তরীণ বিষয় গুপ্তচরদের কাছে পাচার করছে। তাদের রিমান্ডে দিলে রাষ্ট্রদ্রোহিতার সঙ্গে কারা জড়িত, দেশি-বিদেশি কোন কোন গুপ্তচরদের যোগাযোগ তাদের শনাক্ত ও গ্রেফতার করা সম্ভব হবে। তাদের সর্বোচ্চ রিমান্ড প্রার্থনা করছি।"

গ্রেফতারের প্রেক্ষাপট নিশ্চিত করে ডিএমপি মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. আকতার হোসেন জানান, সুনির্দিষ্ট কিছু তথ্য-প্রমাণ ও অভিযোগের ভিত্তিতে সাবেক এই দুই কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ধরে ডিবির নিবিড় নজরদারিতে ছিলেন। প্রাথমিক তদন্তের সূত্র উল্লেখ করে তিনি জানান, আসামিরা দীর্ঘদিন ধরে সরকার ও রাষ্ট্রবিরোধী নানা ধরনের বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট তৈরি করে ভার্চুয়াল দুনিয়ায় ছড়িয়ে দিচ্ছিলেন। কেবল অপপ্রচারই নয়, দেশের সার্বিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যে তাঁরা নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে গোপন যোগসূত্র রক্ষা করছিলেন। সাইবার অপরাধ সংঘটনের মাধ্যমে জননিরাপত্তা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত করার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়ার পরই তাঁদের বিরুদ্ধে এই সাঁড়াশি অভিযান চালানো হয়।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।