ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) নূর নবী সরকারকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত ও সরকারি দপ্তরে ভাঙচুরের ঘটনায় দায়ের করা মামলার প্রধান আসামি মামুনুর রশীদ মামুনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মামুন গণঅধিকার পরিষদের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে পরিচিত। এই গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে চাঞ্চল্যকর এই ঘটনার তদন্তে নতুন মোড় এল এবং এলাকায় প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।
শুক্রবার (১০ এপ্রিল) দিবাগত গভীর রাতে প্রতিবেশী জেলা দিনাজপুরের কোতোয়ালী থানাধীন সুইহারি এলাকার ড্রাইভার পাড়ায় এক ঝটিকা অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশের নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, শুক্রবার রাত সোয়া ৯টার দিকে রাণীশংকৈল থানা পুলিশের একটি চৌকস দল এই বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি বা ‘আইটি ট্র্যাকিং’ ব্যবহার করে আসামির অবস্থান শনাক্ত করা হয়। রাণীশংকৈল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আমানুল্লাহ আল বারীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই অভিযানে দিনাজপুর কোতোয়ালী থানা পুলিশ সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করে। গ্রেপ্তারের পরপরই মামুনকে ঠাকুরগাঁও সদর থানায় পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে এবং আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাঁকে দ্রুতই আদালতের মাধ্যমে জেলা কারাগারে পাঠানো হবে বলে জানা গেছে।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে গত ৭ এপ্রিল রাত আনুমানিক ৯টার দিকে। অভিযোগ অনুযায়ী, মামুনুর রশীদ মামুনের নেতৃত্বে উপজেলা গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি সোহরাব হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক জাফর হোসেনসহ ৮ থেকে ১০ জনের একটি দল রাণীশংকৈল উপজেলা পরিষদ ভবনে অবস্থিত পিআইও কার্যালয়ে অতর্কিতে প্রবেশ করেন। রাতের বেলায় কেন অফিস খোলা রাখা হয়েছে—এই অজুহাতে তাঁরা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। মুহূর্তেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে হামলাকারীরা পিআইও নূর নবী সরকারের ওপর চড়াও হন।
ভুক্তভোগী কর্মকর্তা নূর নবী সরকার দেশ মিডিয়াকে জানান, “মামুন দীর্ঘদিন ধরেই আমার কাছে বিভিন্ন অনৈতিক ও অবৈধ সুবিধা দাবি করে আসছিলেন। একজন সরকারি চাকুরিজীবী হিসেবে আমি তাঁর সেই সব দাবিতে সাড়া দিইনি। এতেই সে আমার ওপর ক্ষিপ্ত ছিল। সেই ক্ষোভ থেকেই পূর্বপরিকল্পিতভাবে সহযোগীদের নিয়ে এসে আমার শার্টের কলার ধরে টানাহেঁচড়া করে এবং আমাকে মারধর করে অফিস তছনছ করে।”
এই নজিরবিহীন হামলার ঘটনায় নূর নবী সরকার বাদী হয়ে মামুনসহ পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে একটি মামলা দায়ের করেন। ওই রাতেই মামলার ৫ নম্বর আসামি জিয়াউর রহমানকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। সরকারি কর্মকর্তার ওপর এমন ন্যাক্কারজনক হামলার প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছে বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন। ৮ এপ্রিল ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তাদের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ এবং বাংলাদেশ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসার সমিতি পৃথক বিবৃতিতে এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি তোলে। একই সুরে প্রতিবাদ জানিয়েছে রাণীশংকৈল অফিসার্স ক্লাবও।
এদিকে, এই মামলায় স্থানীয় সংবাদকর্মী জিয়াউর রহমান জিয়া ও রাকীব ফেরদৌসের নাম জড়ানোয় সাংবাদিকদের একটি অংশ প্রতিবাদ জানিয়েছেন এবং তাঁদের নাম প্রত্যাহারের দাবি তুলেছেন। বিষয়টি স্থানীয় পর্যায়ে বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা রহমতুল্লাহ রনি প্রধান আসামিকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “আমরা সোর্সের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে অভিযানটি পরিচালনা করেছি। অন্য আসামিরা বর্তমানে পলাতক থাকলেও তাঁদের গ্রেপ্তারে আমাদের চিরুনি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।” ওসি আমানুল্লাহ আল বারীও কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন, সরকারি কাজে বাধা প্রদান এবং কর্মকর্তাদের ওপর হামলাকারীদের ছাড় দেওয়া হবে না।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া