শ্রমবাজার খোলার আগেই দালালের দৌরাত্ম্য

দীর্ঘ অপেক্ষার পর বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবারও খুলতে যাচ্ছে। এতে বিদেশে কর্মসংস্থানের প্রত্যাশায় থাকা হাজারো তরুণের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। তবে বাজার পুরোপুরি খোলার আগেই নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা ধরনের বিভ্রান্তি। মালয়েশিয়া সরকার প্রায় এক মাস আগে কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া ও ধাপ প্রকাশ করলেও বাংলাদেশে সেই তথ্য যথাযথভাবে প্রচার না হওয়ায় অনেক চাকরিপ্রত্যাশী এখনো জানেন না কীভাবে, কোন প্রক্রিয়ায় এবং কার মাধ্যমে তারা মালয়েশিয়ায় যেতে পারবেন।

এই তথ্যঘাটতির সুযোগই নিচ্ছে রিক্রুটিং এজেন্সি, ট্রাভেল এজেন্সি, দালাল ও বিভিন্ন মধ্যস্বত্বভোগী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের প্রচারণা চালিয়ে দ্রুত মালয়েশিয়া পাঠানোর আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে। কোথাও চাকরির নিশ্চয়তার কথা বলা হচ্ছে, কোথাও আবার স্বল্প সময়ে ভিসা পাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে। ফলে সরকারি নির্দেশনার চেয়ে দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীদের দেওয়া তথ্যই অনেক চাকরিপ্রত্যাশীর কাছে বেশি বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার সতর্কতামূলক বিজ্ঞপ্তি দিয়ে পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত কাউকে পাসপোর্ট জমা না দিতে, টাকা পরিশোধ না করতে এবং মেডিকেল পরীক্ষা না করাতে বলেছে। কিন্তু এই সতর্কবার্তার মধ্যেও কিছু লাইসেন্সধারী রিক্রুটিং এজেন্সি, ট্রাভেল এজেন্সি ও দালালের তৎপরতা থেমে নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের প্রচারণা অব্যাহত থাকায় বিদেশ যেতে আগ্রহী তরুণদের মধ্যে অনিশ্চয়তা আরও বাড়ছে।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ঘিরে বর্তমান পরিস্থিতি অতীতের অভিজ্ঞতার কথাও মনে করিয়ে দিচ্ছে। বিদেশে যাওয়ার শুরু থেকে বিমানবন্দরে পৌঁছানো পর্যন্ত কর্মীদের নানা ধরনের হয়রানি, অনিশ্চয়তা ও অতিরিক্ত ব্যয়ের মুখোমুখি হওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। মিথ্যা আশ্বাস, তথ্য গোপন, অতিরিক্ত অর্থ দাবি, পাসপোর্ট আটকে রাখা কিংবা পাসপোর্টের অপব্যবহারের মতো অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে।

এসব অনিয়ম হঠাৎ তৈরি হয়নি। বছরের পর বছর বিভিন্ন পর্যায়ে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে তা স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশের মতো হয়ে গেছে। আইন ও বিধিবিধান থাকলেও বাস্তবে সেগুলোর ফাঁকফোকর ব্যবহার করে একটি অনিয়মের সংস্কৃতি গড়ে ওঠার অভিযোগ রয়েছে।

এ অবস্থায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তথ্যের স্বচ্ছতা। নাগরিককে সময়মতো সঠিক তথ্য দেওয়া না হলে শুধু প্রতারণার ঝুঁকি বাড়ে না, নিজের সিদ্ধান্ত যাচাই করার সুযোগও কমে যায়। মালয়েশিয়া সরকার যখন তাদের নিজস্ব মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়ার ধাপ প্রকাশ করেছে, তখন বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোরও দায়িত্ব ছিল সেই তথ্য দ্রুত, সহজ ও পরিষ্কার ভাষায় চাকরিপ্রত্যাশীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

কারণ সরকারি তথ্যের জায়গা ফাঁকা থাকলে সেই জায়গা দখল করবে অন্য কেউ। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ঘিরে বর্তমান পরিস্থিতি তারই একটি উদাহরণ।

মালয়েশিয়া বাংলাদেশের অন্যতম পুরোনো ও গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার। তবে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগও নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে নানা অভিযোগের কারণে বাজার বন্ধ হয়েছে। পরে কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক উদ্যোগে তা আবার চালু হয়েছে। কিন্তু একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ পুনরায় সামনে আসায় বাজার আবারও সংকটে পড়েছে।

ভিসা কেনাবেচা, দালালের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, বিভিন্ন পর্যায়ে ঘুষ, মেডিকেল পরীক্ষা ও বিমান টিকিটের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগ বারবার সামনে এসেছে। এর ফলে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের একটি অংশকে ঘিরে এমন একটি ব্যবসায়িক প্রবণতা তৈরি হয়েছে, যেখানে কর্মীর নিরাপদ ও স্বল্প ব্যয়ে বিদেশযাত্রার চেয়ে দ্রুত অর্থ আয়ের বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

এর সবচেয়ে বড় চাপ পড়ে সাধারণ কর্মীর ওপর। অতিরিক্ত অর্থ খরচ করে বিদেশে গিয়ে চাকরি না পাওয়া, বেতন না পাওয়া, নিয়োগকর্তার প্রতারণার শিকার হওয়া কিংবা আইনি জটিলতায় পড়ার ঘটনাও বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে। কেউ শূন্য হাতে দেশে ফিরেছেন, আবার কেউ অনিয়মিত অবস্থায় থেকে আরও বড় ঝুঁকির মধ্যে পড়েছেন।

এবার নতুন করে আলোচনায় এসেছে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর জন্য ৩৩৮টি বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা। তালিকায় রয়েছে ২৫টি প্রধান এজেন্সি, তাদের অধীনে ২৫০টি সহযোগী এজেন্সি এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড বোয়েসেলের অধীনে ৬২টি এজেন্সি।

এই তালিকা ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে ২৫০টি সহযোগী এজেন্সির ভূমিকা নিয়ে। তারা কি সরাসরি মালয়েশিয়ার নিয়োগদাতার কাছ থেকে চাহিদাপত্র সংগ্রহ করে কর্মী পাঠাতে পারবে, নাকি ২৫টি প্রধান এজেন্সির অধীনে সাব-এজেন্ট হিসেবে কাজ করবে তা স্পষ্ট হওয়া জরুরি। কারণ অতীতের অভিজ্ঞতায় সহযোগী এজেন্সির কাঠামোর আড়ালে কার্যত সিন্ডিকেট ব্যবস্থা তৈরি হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

খাতসংশ্লিষ্ট কয়েকজনের দাবি, তালিকাভুক্ত কিছু এজেন্সির মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা নেই। আবার কিছু প্রধান এজেন্সির বিএমইটি ক্লিয়ারেন্সের মাধ্যমে কর্মী পাঠানোর রেকর্ড নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ফখরুল ইসলাম নতুন ব্যবস্থাকে আগের সিন্ডিকেশন পদ্ধতির সঙ্গে তুলনা করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, অতীতেও অনেক এজেন্সির নাম তালিকায় থাকলেও বাস্তবে সরাসরি নিয়োগের সুযোগ সীমিত ছিল।

তবে সরকারের বক্তব্য ভিন্ন। সরকার জানিয়েছে, ৩৩৮টি এজেন্সি বাংলাদেশ নির্বাচন করেনি; বিদ্যমান সমঝোতা স্মারকের আওতায় মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষই এই তালিকা তৈরি করেছে। দেশটির মানবসম্পদ, পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো সংশ্লিষ্ট এজেন্সিগুলো যাচাই-বাছাই করেছে বলেও জানানো হয়েছে। সরকার ৩৩৮টি এজেন্সির অন্তর্ভুক্তিকে ‘ঐতিহাসিক অর্জন’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।

তবে তালিকা প্রকাশের মধ্য দিয়েই স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে না। কোন এজেন্সি কীভাবে কাজ করবে, কর্মীর কাছ থেকে সর্বোচ্চ কত টাকা নেওয়া যাবে, চাহিদাপত্র কে সংগ্রহ করবে, সহযোগী এজেন্সির ক্ষমতা ও দায়িত্ব কী হবে এবং পুরো প্রক্রিয়া কীভাবে নজরদারির মধ্যে থাকবে এসব বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা প্রয়োজন।

এর মধ্যেই বিশেষ ব্যবস্থায় আগামী তিন মাসে ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মী মালয়েশিয়ায় পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশটির সেবা খাতে শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় এসব কর্মী নিয়োগ করা হবে। সরকারি প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলের মাধ্যমে শূন্য অভিবাসন ব্যয়ে কর্মী পাঠানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। মালয়েশিয়া ডিসেম্বরের মধ্যে ওই খাতে মোট ১৫ হাজার কর্মী নেওয়ার পরিকল্পনা করছে।

২০২৪ সালের ১ জুনের সময়সীমার আগে মালয়েশিয়ায় যেতে না পারা প্রায় ৫ হাজার বাংলাদেশি কর্মীকে প্রথম দফায় অন্তর্ভুক্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রথম দলকে বোয়েসেলের ব্যবস্থাপনায় বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইটে পাঠানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। বিমানভাড়াসহ অন্যান্য অভিবাসন ব্যয়ও বহন করার কথা রয়েছে।

এই উদ্যোগ সফল হলে তা স্বচ্ছ ও নিরাপদ কর্মী পাঠানোর একটি কার্যকর দৃষ্টান্ত হতে পারে। তবে শূন্য অভিবাসন ব্যয়ের এই মডেল কেবল সীমিত সংখ্যক কর্মীর মধ্যে থাকবে, নাকি ভবিষ্যতে বৃহত্তর নিয়োগ ব্যবস্থাতেও এর প্রতিফলন ঘটবে সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

বিদেশে যাওয়ার আগে কর্মীদের বিএমইটিতে নিবন্ধন করতে হয়। ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার, জেলা কর্মসংস্থান অফিস এবং কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র টিটিসিতেও এ নিবন্ধনের সুযোগ রয়েছে। তারপরও মালয়েশিয়ায় যেতে আগ্রহী অনেক তরুণকে প্রয়োজনীয় কাজের জন্য ঢাকামুখী হতে দেখা যায়।

এখানেই আরেকটি প্রশ্ন সামনে আসে সরকারি সেবাগুলো যদি মানুষের দোরগোড়ায় থাকে, তাহলে চাকরিপ্রত্যাশীরা কেন এখনো দালাল ও এজেন্সির ওপর বেশি নির্ভর করবেন?

রামরুর গবেষণাতেও উঠে এসেছে, চাকরিপ্রত্যাশীরা অনেক ক্ষেত্রে সরকারের চেয়ে কাছের দালালের তথ্যকে বেশি বিশ্বাস করেন। বিষয়টি শুধু নাগরিক সচেতনতার ঘাটতি হিসেবে দেখলে সমস্যার পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। সরকারি তথ্য কত দ্রুত, কত সহজে এবং কতটা নির্ভরযোগ্যভাবে মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

মোবাইলভিত্তিক নিবন্ধন ও আঙুলের ছাপ গ্রহণের মতো ব্যবস্থা আরও সহজলভ্য করা গেলে চাকরিপ্রত্যাশীদের ঢাকায় এসে অপ্রয়োজনীয় অর্থ ও সময় ব্যয়ের চাপ কমানো সম্ভব হতে পারে। একইভাবে টিটিসিগুলোকে শুধু প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে নয়, নিরাপদ বৈদেশিক কর্মসংস্থান বিষয়ে তথ্য ও পরামর্শ দেওয়ার কেন্দ্র হিসেবেও আরও কার্যকর করা প্রয়োজন।

বিদেশি শ্রমবাজার খোলা ও বন্ধ হওয়ার ঘটনাকে যদি কেবল রিক্রুটিং ব্যবসার চক্রের অংশ হিসেবে দেখা হয়, তাহলে পুরোনো সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঠেকানো কঠিন হবে। বাজার বন্ধ থাকলে আগাম প্রচারণা, চাহিদা তৈরির নামে অর্থ সংগ্রহ এবং বাজার খোলার পর তাড়াহুড়ো করে কর্মী পাঠানোর প্রবণতা বন্ধ করা জরুরি।

শুধু কতজন কর্মী বিদেশে গেলেন এই সংখ্যাকে সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি করা উচিত নয়। কত কম খরচে, কতটা স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায়, কতটা নিরাপদে এবং কতটা দক্ষ কর্মী বিদেশে গেলেন সাফল্যের মূল্যায়নে এসব বিষয়ও সমান গুরুত্ব পাওয়া দরকার।

বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া শ্রমবাজারের বর্তমান পরিস্থিতি তাই শুধু নতুন করে একটি শ্রমবাজার খোলার বিষয় নয়। এটি একই সঙ্গে পুরোনো ভুল থেকে বেরিয়ে এসে একটি স্বচ্ছ, নিরাপদ ও টেকসই কর্মী পাঠানোর ব্যবস্থা গড়ে তোলার বড় পরীক্ষা।

বর্তমান সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ ৩১ ডিসেম্বর শেষ হওয়ার কথা। এর আগে নতুন চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বার্থ সুরক্ষা এবং ভবিষ্যতে যোগ্য সব রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার প্রত্যাশা করছে সরকার।

তবে শেষ পর্যন্ত বড় প্রশ্ন একটাই এবার কি মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুলবে কর্মীর স্বার্থে, নাকি আবারও মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেটের স্বার্থে? এই প্রশ্নের উত্তরই বলে দেবে, নতুন করে খোলা এই শ্রমবাজার আসলে কতটা নতুন।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।