লতা মঙ্গেশকরের কোলে বসা এই ছোট্ট মেয়েটি আজ দেশের জনপ্রিয় গায়িকা, চিনতে পারছেন?

উপমহাদেশের সুরসম্রাজ্ঞী লতা মঙ্গেশকরের কোলে পরম স্নেহে বসে আছে মিষ্টি চেহারার ৯ বছরের এক ছোট্ট শিশু। আজ মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিন দশকেরও বেশি পুরোনো একটি পারিবারিক স্থিরচিত্র নতুন করে প্রকাশ্যে আসার পর নেটিজেনদের মনে প্রবল কৌতূহল ও প্রশ্নের উদ্রেক হয়—কে এই সৌভাগ্যবতী কন্যা? বিস্ময়কর তথ্য হলো, ছবির সেই ছোট্ট শিশুটি আর কেউ নন; বাংলাদেশের সংগীতজগতের জনপ্রিয় শিল্পী আলিফ আলাউদ্দীন। যাঁর বাবা এ দেশের কালজয়ী ও বহু জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রখ্যাত সুরকার ও সংগীত পরিচালক প্রয়াত আলাউদ্দীন আলী। শৈশবের এক দুর্লভ মুহূর্তে কলকাতার একটি পাঁচতারা হোটেলে উপমহাদেশের সংগীতের জীবন্ত কিংবদন্তির এমন নিবিড় সান্নিধ্য পেয়েছিলেন তিনি। বহু বছর পর আজ সেই বিরল স্মৃতি ও আবেগঘন মুহূর্তের গল্প প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছেন এই গায়িকা।

উপমহাদেশের সংগীতাকাশে লতা মঙ্গেশকর কেবল একটি নাম নন, এক জীবন্ত প্রতিষ্ঠান। তাঁর গান শুনে শেখাই যেখানে যে কোনো শিল্পীর কাছে আজীবন সাধনা ও এক পরম তালিম, সেখানে সরাসরি তাঁর সান্নিধ্য পাওয়া এবং কোলে বসার সুযোগ কতটা অমূল্য, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে কলকাতার ঐতিহাসিক এক সংগীত সফরে গিয়ে লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে তোলা সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি ক্যামেরাবন্দী হয়েছিল। আজ মঙ্গলবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে সেই অমলিন পুরোনো স্থিরচিত্রটি ভক্তদের সঙ্গে শেয়ার করেন আলিফ আলাউদ্দীন। ছবিটি নেটদুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই সংগীতাঙ্গনের মানুষ ও ভক্তদের মাঝে নতুন করে এক নস্টালজিয়া ও আলোড়ন তৈরি হয়েছে।

ছবিটির পেছনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট স্মরণ করে আলিফ জানান, সময়টা ছিল সম্ভবত ১৯৯০ কিংবা ১৯৯১ সাল। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ৯ বছর। ঐতিহাসিক কলকাতা শহরের ৪০০ বছর পূর্তি উদযাপন উপলক্ষে স্থানীয় কলকাতা স্টেডিয়ামে এক সুবিশাল আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছিল। সেই মর্যাদাপূর্ণ মঞ্চে এক অবিস্মরণীয় সংবর্ধনা প্রদান করা হয়েছিল উপমহাদেশের কালজয়ী চার মহীরুহ—বাংলাদেশের রুনা লায়লা, প্রখ্যাত সুরস্রষ্টা আলাউদ্দীন আলী, ভারতের অসমের কিংবদন্তি ভূপেন হাজারিকা এবং সংগীতের দেবী লতা মঙ্গেশকরকে। সেই ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতেই বাবার সফরসঙ্গী হয়ে সপরিবারে কলকাতায় গিয়েছিলেন আলিফ এবং তাঁরা উঠেছিলেন বিখ্যাত গ্র্যান্ড ওবেরয় হোটেলে। সেই একই হোটেলেই আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সংগীতশিল্পী রুনা লায়লার ঐকান্তিক মধ্যস্থতায় লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে তাঁদের সরাসরি সাক্ষাতের মাহেন্দ্রক্ষণটি রচিত হয়।

স্মৃতির ঝাঁপি খুলে আলিফ বলেন, "সম্ভবত ১৯৯০ কিংবা ’৯১ হবে। তখন আমার বয়স ৯ বছর। কলকাতার ৪০০ বছর নিয়ে একটি অনুষ্ঠান হবে কলকাতা স্টেডিয়ামে। সেখানে সংবর্ধনা দেওয়া হয় শ্রদ্ধেয় রুনা লায়লা আন্টি, আব্বু (আলাউদ্দীন আলী), ভূপেন হাজারিকাসহ কিংবদন্তি লতা মঙ্গেশকরকে। মনে আছে, আমরা উঠেছিলাম গ্র্যান্ড ওবেরয় হোটেলে। ওনার সঙ্গে রুনা আন্টির থ্রুতে দেখা করেছিলাম।"

হোটেলের বিলাসবহুল স্যুইটে লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে তাঁদের সেই ঐতিহাসিক সাক্ষাৎকারটি স্থায়ী হয়েছিল আনুমানিক ২০ থেকে ২৫ মিনিট। সময়টা ছিল দুপুর ১২টা বা সাড়ে ১২টার কাছাকাছি। তবে ৯ বছরের অবুঝ আলিফের চেয়েও সেই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি আবেগাপ্লুত ও উচ্ছ্বসিত ছিলেন তাঁর মা, বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী সালমা সুলতানা। মায়ের সেই বাঁধভাঙা অনুভূতির কথা মনে করে আলিফ বলেন, "আমার তো বয়স তখন কম। আমার চেয়ে আম্মুর এক্সাইটমেন্টটা ছিল অনেক বেশি। আম্মু তাঁর অনেক বড় ফ্যান ছিলেন। আম্মুর থ্রুতে তো আমি লতাজির গান শুনেছি। আম্মুর চোখেমুখে যে অভিব্যক্তি ছিল, ওটা দেখে আমিও খুব এক্সাইটেড ছিলাম।"

শৈশবের সরলতায় একজন বিশ্বমানের মহাতারকার সঙ্গে সাক্ষাতের ঐতিহাসিক তাৎপর্য তখন পুরোপুরি অনুধাবন করতে পারেননি ছোট্ট আলিফ। তবে পরিণত বয়সে এসে জীবনের এই প্রাপ্তিকে তিনি সৃষ্টিকর্তার এক পরম আশীর্বাদ মনে করেন। আলিফের ভাষায়, "ওটার বিশালতা বোঝার জন্য তো একটা বয়স লাগে। তখন তো একটা বাচ্চা মানুষ। গেছি, ছবি তুলেছি; একজন বড় তারকার সঙ্গে ছবি তুলেছি। এখন আমি বুঝি, আমি কতটা লাকি। এই জীবনে লতাজির মতো একজন ব্যক্তিত্বের সঙ্গে দেখা হয়েছে আমার।"

সেদিনের মূল কনসার্টে কলকাতা স্টেডিয়ামের মঞ্চে গান পরিবেশন করে দর্শকদের মুগ্ধ করেছিলেন লতা মঙ্গেশকর, রুনা লায়লা এবং ভূপেন হাজারিকা। আর রুনা লায়লার পরিবেশনার সঙ্গে সুর ও সংগীতের একাত্মতা ঘটিয়ে অনন্য পারফর্ম করেছিলেন আলিফের বাবা আলাউদ্দীন আলী।

ছবিটি ফ্রেমবন্দী হওয়ার প্রতিটি ক্ষণ এখনো আলিফের মানসপটে স্পষ্ট। তিনি সেই দৃশ্য বর্ণনা করে বলেন, "এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, রুনা আন্টি আমাদের নিয়ে যাবেন কিংবদন্তি লতা মঙ্গেশকরের রুমে। লিফটে আম্মু রুনা আন্টিকে বললেন, ‘রুনা আপা, আমার খুব নার্ভাস লাগছে।’ রুনা আন্টি হাসলেন, বললেন, ‘ইটস ওকে।’ ওনার হোটেল স্যুইটে বসলাম। উনি রুম থেকে বের হতেই সবাই দাঁড়িয়ে গেলাম। কেমন যেন দ্যুতিময় তিনি।" এরপর আলিফকে কাছে টেনে নেওয়ার মুহূর্ত তুলে ধরে তিনি বলেন, "কিংবদন্তি নিজেই তাঁর পাশে আমাকে আদর করে বসালেন, ছবি তুললেন। তানি লায়লা (রুনা লায়লার মেয়ে), সে–ও ছবি তুলল।"

সাক্ষাতের শেষভাগে গুরুজন ও কিংবদন্তির প্রতি তাঁর বাবা-মায়ের নিবেদন দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন ৯ বছরের আলিফ। তিনি বলেন, "লতাজি উঠে দাঁড়াতে যাচ্ছেন, আম্মু তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে থাকলেন। ওনাকে উঠতে দিলেন না। আমি অবাক হয়ে দেখলাম, কী অদ্ভুত শ্রদ্ধাবোধ! এটা আমার আব্বু-আম্মু দুজনেরই ছিল।"

এত বছর ধরে ছবিটি বিশেষ যত্নে প্রিন্ট করিয়ে পারিবারিক অ্যালবামে রাখা ছিল। সম্প্রতি আলিফের স্বামী কাজী ফয়সাল আহমেদ পারিবারিক অ্যালবাম থেকে অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে ছবিটি স্ক্যান করে ডিজিটাল রূপ দেন। এরপর আলিফ সেটি ফেসবুকে পোস্ট করতেই নেটিজেনদের ইতিবাচক মন্তব্যের জোয়ারে ভাসেন। জীবনের পড়ন্ত বিকেলে এসে ফেলে আসা সেই দুর্লভ স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আবেগাপ্লুত আলিফ আলাউদ্দীন বলেন, "লতাজি নিজেই কিন্তু আমাকে কোলে বসিয়েছিলেন, আমাকে ধরে ছবিটা তুলেছেন। তাঁর মতো একজন কিংবদন্তিকে আমি দেখতে পেরেছি, তাঁর পাশে বসতে পেরেছি, এ অনুভূতি বলে বোঝানোর মতো নয়।" শৈশবের সেই ক্যামেরাবন্দী ২৫ মিনিট আজীবন তাঁর হৃদয়ে এক অমূল্য সম্পদ হয়েই বেঁচে থাকবে।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।