সারাদেশে হাম ও রুবেলা ভাইরাসের সংক্রমণ রুখতে পরিচালিত জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিতে এক অভাবনীয় সাফল্য অর্জিত হয়েছে। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রাকে উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে ছাড়িয়ে এখন পর্যন্ত দেশের ১ কোটি ৯৭ লাখ ৭১ হাজার ৭২০ জন শিশুকে এই টিকার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে, যা পূর্বনির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশেরও বেশি। মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরবচ্ছিন্ন তৎপরতা এবং অভিভাবকদের সচেতনতার ফলেই এই অগ্রগতি নিশ্চিত হয়েছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট নীতি-নির্ধারকদের সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের মার্চ মাসের শেষের দিকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আকস্মিকভাবে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার কালক্ষেপণ না করে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এর অংশ হিসেবে গত ৫ এপ্রিল প্রথম দফায় দেশের ১৮টি জেলার ঝুঁকিপূর্ণ ৩০টি উপজেলায় জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা হয়। পরবর্তীতে দ্বিতীয় ধাপে ১২ এপ্রিল থেকে গুরুত্বপূর্ণ চারটি সিটি কর্পোরেশন—ঢাকা দক্ষিণ, ঢাকা উত্তর, বরিশাল ও ময়মনসিংহে এই বিশেষ কার্যক্রম সম্প্রসারিত হয়। সর্বশেষ তৃতীয় দফায় গত ২০ এপ্রিল থেকে একযোগে সারাদেশজুড়ে হাম-রুবেলার পূর্ণাঙ্গ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা হয়, যা বর্তমানেও অব্যাহত রয়েছে। তবে সংক্রমণ পুরোপুরি নির্মূল করতে এবং অবশিষ্ট শিশুদের সুরক্ষাবলয়ে নিয়ে আসতে আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে সারাদেশে পুনরায় ব্যাপক পরিসরে বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন পরিচালনার ঘোষণা দিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, প্রাথমিক পর্যায়ে দেশব্যাপী প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে হাম-রুবেলার টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। সরকারের নানামুখী কৌশলগত পরিকল্পনা ও মাঠপর্যায়ের জোরদার প্রচারণার ফলে এই অর্জন শেষ পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রার ১০৯ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকারের প্রকৃত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ জন শিশু। বিপরীতে গত ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারাদেশে ১ কোটি ৯৭ লাখ ৭১ হাজার ৭২০ জন শিশুকে টিকার সফল ডোজ দেওয়া সম্পন্ন হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ‘হাম-রুবেলা টিকার সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র’ থেকে সংগৃহীত বিভাগভিত্তিক তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ঢাকা বিভাগে সর্বাধিক সংখ্যক ৪৯ লাখ ১৯ হাজার ৯১৩ জন শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগে ৪৮ লাখ ৪১ হাজার ৯২৪ জন, রাজশাহী বিভাগে ২২ লাখ ১৩ হাজার ১৯৭ জন, রংপুর বিভাগে ২০ লাখ ৭৩ হাজার ৪৮৮ জন, খুলনা বিভাগে ১৬ লাখ ৯৫ হাজার ৭৭৯ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ১৫ লাখ ৩০ হাজার ৯১৬ জন, সিলেট বিভাগে ১৩ লাখ ৮৫ হাজার ৮০৫ জন এবং বরিশাল বিভাগে ১১ লাখ ১০ হাজার ৬৯৮ জন শিশু সুরক্ষামূলক এই টিকা গ্রহণ করেছে।
একই সময়ে দেশের প্রধান প্রধান নগর এলাকা তথা সিটি কর্পোরেশনগুলোতেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশুকে টিকার আওতায় আনা হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে ৫ লাখ ৫৭ হাজার ৬৮৮ জন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে ৪ লাখ ১৮ হাজার ৯৭২ জন শিশু টিকা পেয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে ৩ লাখ ৩৬ হাজার ৮৭০ জন, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনে ২ লাখ ৬ হাজার ৯২৭ জন, খুলনা সিটি কর্পোরেশনে ৯৬ হাজার ৭৯২ জন, নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনে ৮৩ হাজার ৬৯৭ জন, রংপুর সিটি কর্পোরেশনে ৮২ হাজার ২৫৩ জন, সিলেট সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ৭২ হাজার ৩৪৯ জন, রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনে ৬৩ হাজার ৫৯ জন, ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনে ৬২ হাজার ৩০৫ জন, কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনে ৪৮ হাজার ৬৪৩ জন এবং বরিশাল সিটি কর্পোরেশনে ৪৪ হাজার ১১৯ জন শিশুকে সফলভাবে টিকা দেওয়া হয়েছে।
চলমান এই টিকাদান কার্যক্রমের সামগ্রিক অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. জাহিদ রায়হান জাতীয় বার্তা সংস্থা বাসস-কে জানান, শিশুদের নিয়মিত টিকাদান একটি চলমান প্রক্রিয়া। তবে উদ্ভূত স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে সারাদেশে যে জোরদার টিকাদান কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে, তা মূলত সরকারের একটি বিশেষ ও বাড়তি তৎপরতা। এই সমন্বিত উদ্যোগের মূল লক্ষ্যই হলো দেশের প্রতিটি শিশুকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত রাখা, যাতে কোনো শিশুই জীবনরক্ষাকারী এই টিকা পাওয়া থেকে বাদ না পড়ে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।