র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত করে পুলিশের অধীনে গঠিত স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করেছে। বুধবার থেকে বাহিনীর সব কার্যক্রম নতুন নাম এসআরবির অধীনে পরিচালিত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বাহিনী প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি আহসান হাবীব পলাশ।
এর আগে মঙ্গলবার ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন, ২০২৬’-এর প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এর মধ্য দিয়ে র্যাবের পরিবর্তে নতুন নামে কার্যক্রম পরিচালনার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
২০০৪ সালের ২৬ মার্চ গঠনের পর প্রায় সাড়ে ২২ বছর দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিশেষায়িত বাহিনী হিসেবে কাজ করেছে র্যাব। নতুন কাঠামোয় এসআরবি গঠনের পরও এর বিদ্যমান জনবল, সম্পদ ও কাঠামোর বড় অংশ নতুন ইউনিটের অধীনে থাকছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, এসআরবির নিজস্ব পোশাক, লোগো, সদস্যদের ব্যাচ, যানবাহনের রংসহ বিভিন্ন আনুষঙ্গিক বিষয় চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। এসব পরিবর্তন বাস্তবায়নে সময় প্রয়োজন হওয়ায় নতুন নামে কার্যক্রম শুরু হলেও প্রাথমিক পর্যায়ে মাঠপর্যায়ে র্যাবের বিদ্যমান সরঞ্জাম ও অবকাঠামো ব্যবহার করা হবে।
এসআরবির আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এ জেড ইন্তেখাব চৌধুরী বিষয়টি জানিয়েছেন।
র্যাব বিলুপ্ত করে এসআরবি গঠনের লক্ষ্যে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিল, ২০২৬’ গত ১০ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে পাস হয়। ওই বিলে র্যাবের জনবল, ক্ষমতা, কর্তৃত্ব, সম্পদ ও দায়-দেনা নতুন বাহিনীতে হস্তান্তরের বিধান রাখা হয়েছে।
নতুন আইনের গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক হলো, র্যাবের বিদ্যমান কাঠামোর বড় অংশ সরাসরি এসআরবিতে স্থানান্তর করা। আইনে র্যাবের সংশ্লিষ্ট জনবল, আদেশ, ক্ষমতা, কর্তৃত্ব, বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা, তহবিল, নগদ অর্থ ও ব্যাংকে থাকা অর্থ, দায়-দেনা এবং চুক্তি এসআরবির কাছে হস্তান্তরের কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া র্যাবের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি, হিসাব বই, রেজিস্টার, রেকর্ডপত্র ও অন্যান্য দলিলও নতুন ইউনিটের কাছে তাৎক্ষণিকভাবে হস্তান্তর ও ন্যস্ত করার বিধান রয়েছে।
আইন অনুযায়ী, এসআরবি বাংলাদেশ পুলিশের অধীনে একটি বিশেষায়িত ইউনিট হিসেবে কাজ করবে। সরকারের প্রয়োজন অনুযায়ী পুলিশ ও অন্যান্য শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য এবং নির্ধারিতসংখ্যক কর্মকর্তা, সশস্ত্র সদস্য বা কর্মচারীকে পদায়ন কিংবা প্রেষণে নিয়োগের মাধ্যমে ইউনিটটি গঠন করা যাবে।
এসআরবির সদস্যদের পদবিন্যাস, নিয়োগপদ্ধতি এবং চাকরির শর্তাবলি বিধির মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে। ইউনিটের মহাপরিচালক হিসেবে পুলিশে কর্মরত অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তাকে নিয়োগের বিধান রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে এসআরবির নিজস্ব পতাকা, প্রতীক ও নির্ধারিত পোশাক থাকার কথা আইনে বলা হয়েছে।
জননিরাপত্তা রক্ষা, সন্ত্রাসবাদ ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন এবং গুরুতর অপরাধ মোকাবিলাকে এসআরবির প্রধান দায়িত্বের মধ্যে রাখা হয়েছে। পাশাপাশি বেআইনি অস্ত্র, গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক উদ্ধার এবং মাদক ও সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্বও থাকবে ইউনিটটির।
এ ছাড়া গুম ও ভূমিদস্যুতা, নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, মানবপাচার এবং অপহরণের মতো গুরুতর অপরাধ মোকাবিলায় কাজ করবে এসআরবি। আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার দায়িত্বও নির্ধারণ করা হয়েছে।
আদালত, সরকার অথবা পুলিশ মহাপরিদর্শকের নির্দেশে এসআরবি ফৌজদারি অপরাধের তদন্ত করতে পারবে। ফৌজদারি কার্যবিধি ও সংশ্লিষ্ট আইন অনুসরণ করে তল্লাশি, গ্রেফতার এবং আলামত জব্দের ক্ষমতাও থাকবে ইউনিটটির।
আইন অনুযায়ী, এসআরবির সাব-ইন্সপেক্টর বা তার ঊর্ধ্ব পদমর্যাদার কর্মকর্তারা তদন্তকারী কর্মকর্তার নির্ধারিত ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবেন।
এসআরবি সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় অভিযোগ এবং সাধারণ নাগরিকদের অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্যও আইনে পৃথক ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য একাধিক সদস্যের সমন্বয়ে কমিটি গঠনের বিধান রয়েছে। কোনো অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেলে কমিটি অনুসন্ধান করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করতে পারবে।
সদস্যদের পদোন্নতি, পদায়ন, বিভাগীয় শাস্তি, হয়রানি বা অন্যায্য আচরণসংক্রান্ত অভিযোগও এই ব্যবস্থার আওতায় আসবে।
শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে সদস্যদের বিরুদ্ধে বরখাস্ত, অপসারণ, বাধ্যতামূলক অবসর, পদাবনতি এবং পদোন্নতি বন্ধসহ বিভিন্ন ধরনের লঘু ও গুরুদণ্ড দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। পাশাপাশি বিভাগীয় আদেশের বিরুদ্ধে ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করার সুযোগও আইনে রাখা হয়েছে।
ফলে র্যাবের দীর্ঘদিনের কাঠামো বিলুপ্ত করে নতুন নামে এসআরবির কার্যক্রম শুরু হলেও জননিরাপত্তা ও গুরুতর অপরাধ মোকাবিলায় বিশেষায়িত ইউনিট হিসেবে এর দায়িত্বের পরিধি বিস্তৃত রাখা হয়েছে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।