যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য ঠেকাতে চীনের তৎপরতা

বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বিদ্যমান ব্যবস্থার প্রতি চ্যালেঞ্জ বাড়ছে। আর এই পরিবর্তিত বাস্তবতাকে কাজে লাগিয়ে ইউরেশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ শক্তিগুলোকে একই কূটনৈতিক পরিসরে আনতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে চীন। বেইজিংয়ের কৌশলের কেন্দ্রে রয়েছে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারের পাশাপাশি সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা (এসসিও) ও ব্রিকসের মতো বহুপক্ষীয় প্ল্যাটফর্মকে কাজে লাগানো।

চীনের লক্ষ্য এমন একটি বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র এককভাবে বৈশ্বিক এজেন্ডা নির্ধারণ করতে না পারে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বৈঠকেও বেইজিংয়ের এই কৌশলের প্রতিফলন দেখা গেছে।

গেল আগস্টের শেষে কিরগিজস্তানের বিশকেকে এসসিও শীর্ষ সম্মেলন এবং যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলিনার অ্যাশভিলে জি২০ মন্ত্রীপর্যায়ের সম্মেলন-দুই আয়োজনেই চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বৈশ্বিক নেতৃত্বের প্রশ্নে ভিন্ন অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে।

একদিকে চীনের নেতৃত্বে পশ্চিমবিরোধী শক্তিগুলোর সমাবেশ, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে বিদ্যমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামো ধরে রাখার চেষ্টা-দুই সম্মেলন যেন চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার দুটি আলাদা মঞ্চে পরিণত হয়েছে।

মার্কিনবিরোধী জোটে রূপ নিচ্ছে এসসিও

চীন এসসিওকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থার বিকল্প রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বয়ান তৈরির অন্যতম প্রধান প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে। বিশকেকের শীর্ষ বৈঠকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে রাশিয়া ও ইরানের নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক তৎপরতায় দেখা যায়।

শি জিনপিং, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফসহ বিভিন্ন দেশের নেতাদের উপস্থিতি এসসিওর বিস্তৃত পরিসরকে সামনে এনেছে।

চীনের বার্তা ছিল-বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্র শুধু ওয়াশিংটনকে ঘিরে থাকবে না; এশিয়া ও ইউরেশিয়ার শক্তিগুলোও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনও এসসিওর গুরুত্ব তুলে ধরে একে ‘উদীয়মান বহুমেরু বিশ্বের অন্যতম স্বাধীন ও প্রভাবশালী কেন্দ্র’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, এসসিওর সদস্যরাষ্ট্রগুলোতে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক মানুষের বসবাস, যা জোটটির বৈশ্বিক গুরুত্বেরই ইঙ্গিত দেয়।

চীন-রাশিয়া সম্পর্কের নতুন মাত্রা

চীনের এই কৌশলের কেন্দ্রে রয়েছে রাশিয়া। ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে ইউরোপীয় বাজার থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন মস্কো এখন এশিয়াকে গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হিসেবে দেখছে। ফলে চীন-রাশিয়া সম্পর্ক কৌশলগত অংশীদারত্বের পাশাপাশি অর্থনৈতিক নির্ভরতার দিকেও এগোচ্ছে।

বিশকেক সম্মেলনের আগে শি জিনপিং ও পুতিনের বৈঠকে দুই নেতা সম্পর্ক আরও গভীর করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। ‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া-২’ গ্যাস পাইপলাইন নিয়ে আলোচনা দুই দেশের ঘনিষ্ঠতার অন্যতম বাস্তব উদাহরণ।

রাশিয়ার কাছে চীনের বাজার ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, তেমনি বেইজিংয়ের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি চাহিদা মেটাতেও মস্কোর ভূমিকা রয়েছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও বিকল্প বাজারের প্রয়োজন দুই দেশকে আরও কাছাকাছি এনেছে।

ইরানের ক্ষেত্রেও চীন-রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গুরুত্বপূর্ণ। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সংঘাতের চাপের মধ্যে তেহরান এসসিওকে রাজনৈতিক সুরক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে। পাশাপাশি রাশিয়ার সঙ্গে পারমাণবিক শক্তি সহযোগিতা ও অন্যান্য অর্থনৈতিক প্রকল্পও এগিয়ে নিচ্ছে।

অর্থাৎ, ইরানের জন্য চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক শুধু আদর্শগত সংহতির বিষয় নয়; নিষেধাজ্ঞার চাপের মধ্যেও অর্থনীতি ও কূটনীতিতে টিকে থাকার বাস্তব কৌশলের অংশ।

অ্যাশভিলে চীন-যুক্তরাষ্ট্র বিরোধ

অন্যদিকে অ্যাশভিলে অনুষ্ঠিত জি২০ অর্থমন্ত্রীদের বৈঠকে চীন-যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক বিরোধ প্রকাশ্য রূপ নেয়। বৈঠকের অন্যতম প্রধান আলোচ্য ছিল বৈশ্বিক বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা।

যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল, বড় বাণিজ্য উদ্বৃত্তধারী দেশগুলোর ‘নন-মার্কেট’ নীতি ও অতিরিক্ত রপ্তানিনির্ভরতার বিষয়ে জি২০ একটি অবস্থান নিক। কিন্তু বেইজিং এতে আপত্তি জানায়। এর ফলে সর্বসম্মত যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সভাপতিত্বে ‘চেয়ারস স্টেটমেন্ট’ প্রকাশ করা হয়।

বেইজিংয়ের অবস্থান ছিল, চীনের রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি, অতিরিক্ত উৎপাদন ও রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতিকে যেন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতার কারণ হিসেবে তুলে ধরা না হয়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোর অভিযোগ, চীনের বিপুল শিল্প উৎপাদন ও তুলনামূলক সস্তা পণ্যের রপ্তানি তাদের নিজস্ব শিল্প ও কর্মসংস্থানের ওপর চাপ তৈরি করছে।

বিরোধ শুধু বাণিজ্যনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। চীনের বিরল মৃত্তিকা ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। জাপান এ ধরনের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞাকে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য ক্ষতিকর বলে মন্তব্য করেছে।

বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার পথে চীন

চীনের কৌশলের সবচেয়ে বড় প্রভাব হতে পারে বিশ্বব্যবস্থার দ্রুত বহুমেরুকরণ। ওয়াশিংটন যেখানে জি২০, কোয়াড ও অন্যান্য বিদ্যমান কাঠামোর মাধ্যমে নিজের প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টা করছে, বেইজিং সেখানে এসসিও, ব্রিকস এবং দ্বিপক্ষীয় কূটনীতির সমন্বয়ে বিকল্প নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করছে।

এর অর্থনৈতিক প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়া ও ইরান পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার বাইরে বিকল্প বাজার, অর্থায়ন ও জ্বালানি সহযোগিতার পথ খুঁজছে। চীন তার বিশাল বাজার, শিল্প সক্ষমতা ও আর্থিক শক্তিকে এই প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করতে পারলে ইউরেশিয়ায় একটি বিকল্প অর্থনৈতিক বলয় আরও শক্তিশালী হতে পারে।

সব মিলিয়ে, চীনের বর্তমান কূটনৈতিক তৎপরতা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তিকে একই নেটওয়ার্কে যুক্ত করে দীর্ঘমেয়াদে একটি বহুমেরু আন্তর্জাতিক কাঠামো গড়ে তোলাই বেইজিংয়ের বড় কৌশলগত লক্ষ্য হিসেবে সামনে আসছে।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।