বাংলাদেশের ই-কমার্স খাতের এক সময়ের অপ্রতিরোধ্য ব্র্যান্ড এবং অনলাইন গ্রোসারি ব্যবসার পথপ্রদর্শক ‘চালডাল ডটকম’ এখন এক চরম অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি। ২০১৩ সালে ‘সময় বাঁচাও, খরচ বাঁচাও’ স্লোগান নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই প্রতিষ্ঠানটি ঢাকা, চট্টগ্রাম, যশোর ও সিলেটের মতো বড় শহরগুলোতে দ্রুততম সময়ে পণ্য পৌঁছে দিয়ে সাধারণ মানুষের নির্ভরতা জয় করেছিল। তবে ২০২৬ সালের মার্চে এসে সেই সফলতার গল্পে বড় ধরনের ধস নেমেছে। বিশেষ করে যশোরের শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কে অবস্থিত চালডাল ডটকমের কল সেন্টারের ছয় শতাধিক কর্মীর তিন মাসের বকেয়া বেতনকে কেন্দ্র করে এক ভয়াবহ মানবিক ও প্রশাসনিক বিপর্যয় তৈরি হয়েছে।
যশোরের এই কল সেন্টারে কর্মরত বিপুল সংখ্যক কর্মী গত তিন মাস ধরে কোনো বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। মাসের পর মাস পারিশ্রমিকহীন থাকায় এই কর্মীদের জীবন এখন চরম সংকটাপন্ন। দৈনন্দিন বাজার খরচ, সন্তানের দুধের টাকা জোগাড় করা কিংবা ঘরভাড়ার গঞ্জনা সইতে সইতে দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে এই শ্রমজীবী মানুষগুলোর। বকেয়া পাওনার দাবিতে তারা কয়েক দিন ধরে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করে আসলেও গত সোমবার পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। ক্ষুব্ধ কর্মীরা পার্কের ভেতরে ঢুকে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে প্রধান ফটক বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে উত্তেজিত হয়ে কর্মীরা ফটক ভাঙচুর করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোতে ফুটে উঠেছে কর্মীদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও বঞ্চনার চিত্র।
বিস্ময়কর তথ্য হলো, চালডাল ডটকম প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত দেশি ও বিদেশি প্রভাবশালী বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ন্যূনতম ৩০০ কোটি টাকা বা তারও বেশি বিনিয়োগ সংগ্রহ করেছে। সিলিকন ভ্যালির বিশ্বখ্যাত স্টার্টআপ এক্সিলারেটর ‘ওয়াই কম্বিনেটর’ (Y Combinator), ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (IFC) এবং ‘এল ক্যাটারটন’-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এই প্রতিষ্ঠানে কোটি কোটি টাকা ঢেলেছে। এছাড়া দেশীয় অর্থায়নের ক্ষেত্রেও পিছিয়ে নেই তারা। সরকারি প্রতিষ্ঠান ‘স্টার্টআপ বাংলাদেশ লিমিটেড’ ২০২২ সালে ৫ কোটি টাকার ফলো-অন বিনিয়োগসহ একাধিকবার প্রতিষ্ঠানটিতে অর্থায়ন করেছে। পাশাপাশি আইডিএলসি (IDLC) এবং ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে ‘বাংলাদেশ ভেঞ্চার ক্যাপিটাল লিমিটেড’ (BVCL)-ও চালডালে বিশাল বিনিয়োগ করেছে।
পাহাড়সম এই বিদেশি ও দেশি পুঁজি পাওয়ার পরও মাঠপর্যায়ের কর্মীদের বেতন দিতে না পারার বিষয়টি ই-কমার্স বিশ্লেষকদের ভাবিয়ে তুলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মূলত অতি-আগ্রাসী সম্প্রসারণ নীতি, আয়ের তুলনায় অতিরিক্ত পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার কারণে নতুন বিনিয়োগ আসতে দেরি হওয়া—এই তিন কারণেই চালডাল আজ খাদের কিনারায়। কর্মীদের বেতন দিতে না পারা যেকোনো প্রতিষ্ঠানের দেউলিয়া হওয়ার প্রাথমিক সংকেত হিসেবে দেখা হয়। অথচ এই ডেলিভারি ম্যান এবং কল সেন্টার কর্মীরাই রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে মানুষের দুয়ারে পণ্য পৌঁছে দিয়ে চালডালকে আজকের এই উচ্চতায় নিয়ে এসেছিলেন।
উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের (আইসিটি) যুগ্ম সচিব (প্রশাসন অধিশাখা) মোহাম্মদ সাইফুল হাসান জানিয়েছেন, বিষয়টি মূলত বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ও কর্মীদের অভ্যন্তরীণ সংকট হলেও তারা একে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। তিনি জানান, যশোরের বিনিয়োগকারী সংগঠনের সঙ্গে অনলাইনে সভা করে দ্রুত সমাধানের পথ খোঁজা হচ্ছে। চালডালের মতো একটি প্রতিশ্রুতিশীল স্টার্টআপ কেন এই করুণ দশায় পড়ল, তা খতিয়ে দেখার পাশাপাশি কর্মীদের পাওনা পরিশোধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে প্রতিষ্ঠানটিকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে দেশের অন্যতম সফল এই ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ অন্ধকার বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।