মেয়র থেকে ভূমিমন্ত্রী, তবুও বদলায়নি মিজানুর রহমান মিনুর সেই চিরচেনা রিকশাভ্রমণ

মেয়র থেকে ভূমিমন্ত্রী, তবুও বদলায়নি মিজানুর রহমান মিনুর সেই চিরচেনা রিকশাভ্রমণ

গত ১২ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতে যখন রাজশাহী জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল ঘোষণা করা হচ্ছিল, তখন পুরো শহর জুড়ে ছিল টানটান উত্তেজনা। সেই রাতে রাজশাহী-২ (সদর) আসনে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী মিজানুর রহমান মিনু। বিজয়ের পরদিন সকালেই যখন এই প্রতিনিধির পদচারণা মিনুর পদ্মা আবাসিক এলাকার বাড়ির সামনে, তখন দেখা মিলল এক অভাবনীয় দৃশ্যের। কোনো বিলাসবহুল গাড়ি বা সাঙ্গপাঙ্গ নয়, বরং একটি সাধারণ রিকশায় চড়ে থলেভর্তি কাঁচাবাজার নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন নবনির্বাচিত এই সংসদ সদস্য।


হাসিমুখে মিজানুর রহমান মিনু জানালেন তাঁর এই সরল জীবনবোধের নেপথ্য কারণ। তিনি বলেন, “আমি এই শহরেরই সন্তান। রাজশাহীর মাটি আর মানুষের সঙ্গে আমার নাড়ির টান। বহু বছর ধরে আমি এভাবেই রিকশায় চড়ে অভ্যস্ত। গত ১৭ বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝেও আমার এই চলন-বলন পাল্টায়নি। এই শহরের মানুষ আমাকে কেবল এমপি বা মেয়র হিসেবে দেখে না; কেউ ভাই মনে করে, কেউ ভাবে চাচা। এই আত্মিক সম্পর্কটাই আমার রাজনীতির আসল ‘পাওয়ার’ বা শক্তি।”


মিনুর এই সাদামাটা জীবনযাপনের চিত্র কেবল এমপি হওয়ার দিনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ভূমিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর তিন দিনের সরকারি সফরে যখন তিনি প্রথমবার নিজ এলাকা রাজশাহীতে পা রাখলেন, তখনও তিনি চমকে দিলেন সবাইকে। রাষ্ট্রীয় প্রটোকলের প্রথাগত আড়ম্বর দূরে ঠেলে তিনি সেই পুরোনো অভ্যাসেই রিকশায় চেপে বসলেন। শহরের মোড়ে মোড়ে সাধারণ মানুষের সাথে চায়ের দোকানে আড্ডায় মাতলেন, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করলেন-যা দেখে রাজশাহীর আমজনতার মধ্যে তৈরি হয়েছে ব্যাপক উচ্ছ্বাস।


দীর্ঘ ১০ বছর ধরে মিনুর রিকশা চালাচ্ছেন আব্দুল কুদ্দুস। আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি বলেন, “স্যার আগে যেভাবে আমার রিকশায় চড়ে চলাফেরা করতেন, বড় মন্ত্রী হওয়ার পরও ঠিক একইভাবে সাধারণ মানুষের মতো চলাফেরা করছেন। প্রটোকল ছাড়া তাঁর এই রিকশাভ্রমণ আমাদের মতো সাধারণ মানুষের প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসারই প্রমাণ।”


রাজশাহীর রাজনীতিতে মিজানুর রহমান মিনু এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী নাম। প্রায় তিন দশক ধরে রাজশাহী বিএনপির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছেন তিনি। ১৯৯১ সালে প্রথমবার মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে টানা তিন মেয়াদে প্রায় ১৭ বছর তিনি এই সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব পালন করেন। রাজশাহীকে একটি তিলোত্তমা শহর হিসেবে গড়ে তোলার নেপথ্যে তাঁর কারিগরি দক্ষতা ও প্রশাসনিক দূরদর্শিতা অনস্বীকার্য। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তিনি সফলতার সঙ্গে সংসদ সদস্যের দায়িত্বও পালন করেছিলেন।


মিনুর রাজনৈতিক সততা ও আনুগত্যের বড় পরীক্ষা গিয়েছিল ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে। সে সময় তাঁকে দল ত্যাগের নানা প্রলোভন ও চাপ দেওয়া হলেও তিনি দৃঢ়ভাবে ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, বেগম খালেদা জিয়ার নির্দেশনার বাইরে তিনি এক চুলও নড়বেন না। সেই আপসহীন অবস্থানের কারণে তাঁকে দীর্ঘ সময় কারাভোগও করতে হয়েছিল।


এবারের নির্বাচনে মিজানুর রহমান মিনু ১ লাখ ২৮ হাজার ৫৪৬ ভোট পেয়ে বিপুল ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর পেয়েছেন ১ লাখ ৩৭০ ভোট। দলীয় নেতাকর্মীরা মনে করছেন, প্রবীণ এই নেতার নেতৃত্বেই রাজশাহী অঞ্চলের আগামীর রাজনীতি আবর্তিত হবে। রাজশাহী জেলা কৃষক দলের আহ্বায়ক শফিকুল আলম সমাপ্ত বলেন, “মিজানুর রহমান মিনু কেবল একজন মন্ত্রী নন, তিনি এই অঞ্চলের জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রাণপুরুষ। তাঁর হাত ধরেই রাজশাহীর আগামীর উন্নয়ন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হবে।”


একদিকে মন্ত্রিত্বের গুরুদায়িত্ব, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের সাথে মিশে থাকা ‘মাটির মানুষ’ হিসেবে নিজের স্বকীয়তা বজায় রাখা-সব মিলিয়ে মিজানুর রহমান মিনু এখন রাজশাহীর রাজনীতির এক আদর্শিক মডেলে পরিণত হয়েছেন।


ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।