মারিব-তাইজে হুতিদের তীব্র অগ্রযাত্রা: রিয়াদ ও ওয়াশিংটনের কপালে নতুন ভাঁজ

 ইয়েমেনের রণক্ষেত্রে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের সঙ্গে দেশটির আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারি বাহিনীর সংঘাত নতুন করে ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলোর দিকে হুতি যোদ্ধারা যেভাবে নিজেদের অবস্থান বিস্তৃত করছে, তাতে সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর সামরিক এবং ভূরাজনৈতিক চাপ বহুগুণ বেড়ে গেছে। বিদ্রোহীদের এই অগ্রযাত্রা রুখতে সরকারি বাহিনী ক্রমাগত বিমান হামলা চালালেও মাঠপর্যায়ে হুতিদের অগ্রগতি থামানো কঠিন হয়ে পড়ছে।

বর্তমানে সংঘাতের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে উত্তরাঞ্চলীয় মারিব প্রদেশ। এই এলাকাটি উত্তর ইয়েমেনে সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা সর্বশেষ বড় এবং সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক ঘাঁটি। একই সঙ্গে মারিবে রয়েছে দেশটির বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাসসম্পদ। আন্তর্জাতিক সামরিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মারিবের পতন ঘটলে তা পুরো ইয়েমেন যুদ্ধের ভারসাম্যে এক নাটকীয় পরিবর্তন আনবে এবং ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সার্বিক ভূরাজনীতিতেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে।

মারিবের পাশাপাশি পশ্চিম ইয়েমেনের তাইজ অঞ্চলেও সংঘাত মারাত্মক আকার নিয়েছে। গত সপ্তাহে তাইজের পশ্চিমাঞ্চলের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হুতি বিদ্রোহীরা নিজেদের দখলে নেয়। হারানো ভূখণ্ড পুনর্দখলে সৌদি আরব-সমর্থিত সরকারি বাহিনী বর্তমানে সেখানে জোরদার পাল্টা অভিযান পরিচালনা করছে। এর অংশ হিসেবে সোমবার ইয়েমেনের সেনাবাহিনী একটি ভিডিও প্রকাশ করে দাবি করেছে, বিমান হামলায় হুতিদের শক্ত ঘাঁটি ও সামরিক যানবাহন ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।

এদিকে, সংঘাতের এই চরম বিস্তারে হাজার হাজার নিরীহ বেসামরিক মানুষ চরম মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, চলতি সেপ্টেম্বর মাসের শুরু থেকেই তীব্র লড়াইয়ের কারণে ইয়েমেনে ৮৫ হাজারের বেশি মানুষ নতুন করে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এর মধ্যে প্রাণ বাঁচাতে দুই হাজারের বেশি মানুষ সমুদ্র পাড়ি দিয়ে আফ্রিকার দেশ জিবুতির উত্তর উপকূলে গিয়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন।

মারিব কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
উত্তর ইয়েমেনে হুতিবিরোধী জোটের শেষ ভরসাস্থল মারিব যদি বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তবে উত্তরাঞ্চলে সরকারি অস্তিত্ব পুরোপুরি মুছে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। সামরিক আধিপত্যের পাশাপাশি মারিবের অর্থনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। ইয়েমেনের প্রধান প্রধান তেল ও গ্যাসক্ষেত্রগুলোর অবস্থান এই মারিবেই। ফলে এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ যার হাতে থাকবে, তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই দেশের জাতীয় জ্বালানি অবকাঠামো এবং রাজস্বের প্রধান উৎসের চাবিকাঠি পেয়ে যাবে।

ইয়েমেনের রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাদ্দাম আল-হুরাইবি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে জানান, গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে মারিবের খনিজ সম্পদের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে হুতিরা। বড় ধরনের চূড়ান্ত সামরিক পরাজয় ছাড়া গোষ্ঠীটি কোনোভাবেই এই লক্ষ্য থেকে পিছু হটবে না। মারিব দখল করতে পারলে ভবিষ্যতের যেকোনো রাজনৈতিক আলোচনা বা যুদ্ধবিরতির টেবিলে হুতিরা নিজেদের শর্তে বিশ্বশক্তিগুলোকে বাধ্য করতে পারবে।

মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘নিউ আমেরিকা’র ‘ফিউচার সিকিউরিটি প্রোগ্রাম’-এর ফেলো অ্যাডাম ব্যারনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মারিবের পতন ইয়েমেনের রাজনৈতিক ও সামরিক প্রেক্ষাপটে একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ মোড়’ হয়ে দাঁড়াবে। তবে এই লড়াই সরকারি বাহিনীর জন্য এক ‘অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই’। তাঁর মতে, মারিব হাতছাড়া হওয়া মানে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের জন্য হবে এক ‘চরম পরাজয়’।

ভৌগোলিক দিক থেকেও মারিবের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উত্তর ইয়েমেন থেকে দক্ষিণের শাবওয়া এবং আল-মাহরা প্রদেশে যাওয়ার মূল সড়কটি মারিবের ওপর দিয়ে গেছে। উল্লেখ্য, শাবওয়ার পাশেই রয়েছে এডেন উপসাগর ও আরব সাগরের সুবিশাল উপকূল।

ইয়েমেনি মানবাধিকারকর্মী ও লেখক নাবিল হেতারির মতে, মারিবে জয় পেলে হুতিরা মনস্তাত্ত্বিক ও প্রচারণার দিক থেকেও বড় সুবিধা পাবে, যা তাদের বাহিনীর মনোবল আরও বাড়িয়ে দেবে।

পাশাপাশি মারিবের মানবিক দিকটিও বেশ গভীর। ২০১৪ সালে বিদ্রোহীরা রাজধানী সানা দখলের পর সেখান থেকে পালিয়ে আসা লাখ লাখ মানুষ মারিবে আশ্রয় নেন। আইওএম-এর ২০২৩ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইয়েমেনে দেশের অভ্যন্তরে বাস্তুচ্যুত প্রায় ২৮ লাখ মানুষের মধ্যে ৫৮ শতাংশেরও বেশি মানুষ কেবল মারিবেই বসবাস করছেন।

তাইজ ও বাব আল-মানদেবের কৌশলগত সমীকরণ
শুধু মারিব নয়, তাইজ অঞ্চলের কৌশলগত অবস্থানও সামরিক দিক থেকে সমান তাৎপর্যপূর্ণ। তাইজ মূলত হুতিদের উত্তরাঞ্চল, সরকারের দক্ষিণাঞ্চল এবং লোহিত সাগর উপকূলকে সংযুক্ত করেছে। এর নিয়ন্ত্রণ থাকলে দেশের অভ্যন্তরীণ পথ দিয়ে দক্ষিণের প্রধান বন্দরনগরী এডেনে সামরিক রসদ ও অস্ত্র পরিবহন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

২০১৪ সালে সানার পতনের পর থেকেই অন্যতম জনবহুল এই শহরটি হুতিদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের শক্ত ঘাঁটি ছিল। গত কয়েক বছরের অচলাবস্থা ভেঙে তাইজে হুতিদের বড় অগ্রগতি হলে তা হবে অত্যন্ত প্রতীকী ও কৌশলগত এক আঘাত।

তাইজের উপকূল ধরে এগোলেই মেলে ঐতিহাসিক বন্দরনগরী মোখা, যা গত সপ্তাহেই হুতিরা নিজেদের দখলে নিয়েছে। এই উপকূলরেখা সরাসরি চলে গেছে বাব আল-মানদেব প্রণালি পর্যন্ত। প্রায় ২০ কিলোমিটার (১২ মাইল) প্রশস্ত এই সংকীর্ণ জলপথটি ইয়েমেন ও জিবুতির মাঝখানে অবস্থিত, যা লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করে এশিয়া ও ইউরোপের আন্তর্জাতিক সমুদ্র বাণিজ্যের অন্যতম লাইফলাইন হিসেবে কাজ করে। সংঘাত বৃদ্ধির আগে বিশ্বের মোট বাণিজ্যের প্রায় ১২ শতাংশ এই নৌপথ দিয়ে পরিচালিত হতো।

সম্প্রতি হুতি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগর উপকূলের বড় অংশের পাশাপাশি বাব আল-মানদেব প্রণালিতে অবস্থিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ময়ুন (পেরিম) দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেছে। গত শুক্রবার দ্বীপটি দখলে নেওয়ার পর হুতিরা এই পথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার সরাসরি হুমকি দেয়।

ইয়েমেনি বিশ্লেষক ও লেখক ফুয়াদ মুসেদ বলেন, বিশ্ব বাণিজ্যের এই লাইফলাইনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোর ওপর ভূরাজনৈতিক চাপ তৈরি করাই হুতিদের মূল কৌশল। মুসেদের মতে, ইরান যেভাবে হরমুজ প্রণালিকে ব্যবহার করে বৈশ্বিক চাপ সৃষ্টি করে, হুতিরাও বাব আল-মানদেব ও লোহিত সাগরে একই কৌশল প্রয়োগ করছে।

বাব আল-মানদেবের নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়া সৌদি আরবের জন্য এক বিশাল জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করেছে। কারণ, হরমুজ প্রণালির ঝুঁকি এড়াতে বিকল্প হিসেবে সৌদি আরব লোহিত সাগরের নৌপথ ব্যবহার করে যে তেল রপ্তানি করত, তা এখন সরাসরি হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও নৌ-অবরোধের আওতায় চলে এসেছে।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।