বাংলাদেশের ইফতার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ খেজুর। তবে দেড়-দুই দশক আগেও দেশের খেজুরের বাজার বলতে যা বোঝাত, তার প্রায় পুরোটা জুড়েই ছিল মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর আধিপত্য। কালের বিবর্তনে বাঙালির খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন, স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সারা বছর খেজুর খাওয়ার প্রবণতা বাড়ায় আমদানির এই চিরচেনা চিত্রে এসেছে নাটকীয় পরিবর্তন। এখন আর কেবল সৌদি আরব বা ইরান নয়, সুদূর আমেরিকা বা ইউরোপের খেজুরও জায়গা করে নিচ্ছে সাধারণ মানুষের দস্তরখানে। আমদানির উৎসে এই বিশাল বৈচিত্র্য দেশের বাণিজ্য খাতে নতুন এক মেরুকরণ সৃষ্টি করেছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০০৫-০৬ অর্থবছরেও বাংলাদেশ মাত্র পাঁচটি দেশ থেকে খেজুর আমদানি করত, যার সিংহভাগ অর্থাৎ ৭৩ শতাংশ আসত ইরান থেকে। সে সময় খেজুর ছিল মূলত একটি মৌসুমী ফল, যা কেবল রমজান মাসেই দেখা যেত। কিন্তু বর্তমানে সারা বছর চাহিদা থাকায় বার্ষিক আমদানির পরিমাণ প্রায় এক লাখ টনের কাছাকাছি পৌঁছেছে। এনবিআরের সর্বশেষ তথ্যমতে, গত বছর বাংলাদেশ বিশ্বের ২৩টি ভিন্ন ভিন্ন দেশ থেকে মোট ৯২ হাজার টন খেজুর আমদানি করেছে। যদিও আমদানির প্রায় ৮৮.৫৯ শতাংশ এখনো ইরাক, ইরান ও সৌদি আরবের মতো মধ্যপ্রাচ্যের ছয়টি দেশ থেকে আসছে, তবুও আফ্রিকা ও পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলোর অংশগ্রহণ দ্রুত বাড়ছে। তিউনিসিয়া ও মিসরের পাশাপাশি এখন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এমনকি জাপান থেকেও খেজুর আসছে বাংলাদেশে।
বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের খেজুর এখন দেশের উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের নজর কাড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে খেজুর উৎপাদনে শীর্ষ ২০ দেশের তালিকায় থাকা যুক্তরাষ্ট্র মূলত ক্যালিফোর্নিয়ার বিখ্যাত ‘মেডজুল’ জাতের খেজুর রপ্তানি করে। বাংলাদেশে মার্কিন খেজুরের যাত্রা খুব বেশি দিনের নয়। ২০১৫ সালের ১৮ অক্টোবর ঢাকার সামিয়া এন্টারপ্রাইজ প্রথমবারের মতো শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে মাত্র ৩১৪ কেজির একটি চালান এনেছিল। এক দশকের ব্যবধানে সেই চিত্র এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসেই ঢাকার উত্তরা ফ্রুটস তিন চালানে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ৪৭ হাজার কেজি খেজুর আমদানি করেছে। প্রায় ৭৯ হাজার ডলার ব্যয়ে আমদানিকৃত এই চালানের শুল্কায়নমূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় দুই কোটি টাকা, যেখানে প্রতি কেজি খেজুরে আমদানিকারককে শুল্ক-কর দিতে হয়েছে প্রায় ১৯০ টাকা।
আমদানিকারকদের মতে, ক্যালিফোর্নিয়ার মেডজুল খেজুর আকারে বড়, মাংসল এবং সুস্বাদু হওয়ায় এর জন্য আলাদা একটি ‘প্রিমিয়াম’ বাজার তৈরি হয়েছে। দাম বেশি হওয়া সত্ত্বেও গুণগত মানের কারণে অনেক ক্রেতাই এখন এই মার্কিন জাতের দিকে ঝুঁকছেন। যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কমিশনের তথ্যমতে, ২০২৪ সালে দেশটির খেজুর রপ্তানির গন্তব্যের তালিকায় বাংলাদেশ ছিল ২৮তম স্থানে। কিন্তু অবিশ্বাস্য গতিতে মাত্র এক বছরে ৯ ধাপ এগিয়ে ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ১৯তম স্থানে উঠে এসেছে। গত বছর যুক্তরাষ্ট্র খেজুর রপ্তানি করে বিশ্ববাজার থেকে প্রায় ১২ কোটি ৩৮ লাখ ডলার আয় করেছে, যার মধ্যে বাংলাদেশ থেকেই এসেছে প্রায় ২ কোটি টাকা।
বাংলাদেশে খেজুরের এই বিশাল বাণিজ্যিক সম্ভাবনা দেখে খোদ মার্কিন কূটনৈতিক মহলও এখন বেশ তৎপর। বছরে প্রায় ১৪ কোটি ডলারের এই বিশাল বাজারের প্রসারে গত রবিবার ঢাকার খুচরা বাজার পরিদর্শনে গিয়েছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন এবং দূতাবাসের অ্যাগ্রিকালচারাল অ্যাটাশে এরিন কোভার্ট। বর্তমানে বাংলাদেশে খেজুরের বাজার বার্ষিক ১৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা কেবল বৈশ্বিক রপ্তানিকারক দেশগুলোর জন্যই নয়, বরং দেশীয় আমদানিকারকদের জন্যও এক বিশাল বাণিজ্যিক দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।