মধ্যপ্রাচ্য উত্তপ্ত হতেই তেলের বাজারে বিস্ফোরণ, নেপথ্যে যে সংকট

মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়া তুমুল সামরিক সংঘাত ও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বাড়তে থাকা গভীর অনিশ্চয়তার ধাক্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের মনস্তাত্ত্বিক সীমা অতিক্রম করেছে। বুধবার সিঙ্গাপুর থেকে আন্তর্জাতিক বার্তাসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানানো হয়, বৈশ্বিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচার্সের দাম একলাফে ২.০১ ডলার বা ২.০৫ শতাংশ বেড়ে ১৯৯.৯৩ ডলারে পৌঁছায়। কার্যদিবসের লেনদেনের একপর্যায়ে প্রতি ব্যারেল তেলের দর ১০০.১৯ ডলার পর্যন্ত স্পর্শ করে, যা গত ২৪ জুলাইয়ের পর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের সর্বোচ্চ মূল্যবৃদ্ধির রেকর্ড।

আন্তর্জাতিক তেলের বাজারের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার প্রভাব পড়েছে মার্কিন বাজারেও। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান মানদণ্ড ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের মূল্য ব্যারেলপ্রতি ১.৪৯ ডলার বা ১.৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৯৪.৫২ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে।

বাজারের ঐতিহাসিক গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামে তীব্র অস্থিরতা শুরু হয়। সংঘাতের প্রাথমিক ধাক্কায় গত ৩০ এপ্রিল ব্রেন্ট ক্রুডের দাম রেকর্ড সর্বোচ্চ ১২৬.৪১ ডলারে উঠেছিল। পরবর্তী সময়ে দাম কিছুটা কমতির দিকে থাকলেও, গত মাসের শুরু থেকে ছয় মাসব্যাপী চলা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংকটের স্থায়ী সমাধানের আশা ক্রমে ফিকে হয়ে আসায় ব্রেন্ট ক্রুডের দাম আবারও প্রায় এক-চতুর্থাংশ বৃদ্ধি পায়।

চলতি সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও চরম আকার ধারণ করেছে। জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের প্রত্যক্ষ হামলা, কৌশলগত হরমুজ প্রণালির সন্নিকটে তেলবাহী ট্যাংকার ডুবিয়ে দেওয়ার পর একের পর এক বাণিজ্যিক জাহাজে আক্রমণ এবং ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের ড্রোন হামলায় সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা পুরো অঞ্চলকে এক মহাবিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে। এসব সামরিক তৎপরতা সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাকে বহুগুণ বাড়িয়ে তুলেছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহনের অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য রুট হিসেবে পরিচিত লোহিত সাগরের নৌপথকেও নজিরবিহীন ঝুঁকিতে ফেলেছে। উল্লেখ্য, যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হতে শুরু করলে লোহিত সাগরই ছিল প্রধান বিকল্প করিডোর, যা এখন চরম হুমকির মুখে পড়েছে।

আন্তর্জাতিক তেলবাজার বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের প্রভাবে তেল সরবরাহ পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে বিশ্ব অর্থনীতি এখন চরম উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বখ্যাত গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্যাপিটাল ইকোনমিক্সের জ্যেষ্ঠ ক্লাইমেট অ্যান্ড কমোডিটিস অর্থনীতিবিদ হামাদ হুসেইন পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে জানান, সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক তেলবাহী জাহাজে আক্রমণের কারণে ওমান উপসাগরে এতদিন চালু থাকা ‘জাহাজ থেকে জাহাজে’ (শিপ-টু-শিপ) তেল স্থানান্তরের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া থমকে যাওয়ার আশঙ্কাই এখন প্রধান ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। মূলত আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ অক্ষুণ্ণ রাখা ও তেলের মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে এই স্থানান্তর কৌশলটি অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে আসছিল।

এদিকে স্বাধীন জ্বালানি গবেষণা সংস্থা রাইস্টাড এনার্জির প্রধান অর্থনীতিবিদ ক্লদিও গালিম্বার্থির দেওয়া চাঞ্চল্যকর তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ আগস্ট সংঘাত পুনরুজ্জীবিত হওয়ার আগের সপ্তাহেও হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৮০ লাখ থেকে ৯০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবাহিত হচ্ছিল, যা এর পূর্ববর্তী সপ্তাহের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ ছিল। তবে সাম্প্রতিক সংঘাতের পর সেই সরবরাহ আশঙ্কাজনকভাবে ধসে পড়েছে এবং বর্তমানে তা প্রতিদিন ২০ লাখ ব্যারেলের নিচে নেমে এসেছে।

জ্বালানি বাজারের এই সংকটময় ভবিষ্যৎ নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছেন অ্যাবাক্স মার্কেটসের সহ-চেয়ারম্যান জেফ্রি কারি। তিনি পরিস্থিতির গভীরতা বিশ্লেষণ করে মন্তব্য করেন, জ্বালানির বৈশ্বিক বাজারে মূল্যের এই আকস্মিক বৃদ্ধিকে কোনোভাবেই নিছক সাময়িক ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি মূলত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার এক গভীর কাঠামোগত সমস্যা, যা খুব দ্রুত সমাধানের কোনো ইঙ্গিত নেই। কারি এই মূল্যস্ফীতিকে সরাসরি তথাকথিত ‘নিরাপত্তা প্রিমিয়াম’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা যতদিন থাকবে, এই ব্যয়ভার দিনে দিনে কেবল আরও বাড়বে।

যদিও পরিস্থিতি সামাল দিতে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং গায়ানার মতো নন-ওপেকভুক্ত জ্বালানি উৎপাদক দেশগুলো তাদের দৈনিক উৎপাদন কিছুটা বাড়িয়েছে, তবুও সামগ্রিক ঘাটতি পূরণে তা যথেষ্ট নয়। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) গত মাসেই কড়া সতর্কতা জারি করে জানিয়েছে যে, চলমান ভূরাজনৈতিক সংঘাতের ফলে চলতি বছরে বিশ্বব্যাপী সামগ্রিক তেল সরবরাহ প্রতিদিন গড়ে ৪৩ লাখ ব্যারেল বা প্রায় ৪ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।