মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের নতুন ফ্রন্ট: মিসরের গ্যাস বন্দরে ড্রোন হামলায় লণ্ডভণ্ড জাহাজ, বিশ্বজুড়ে জ্বালানি আতঙ্ক

মধ্যপ্রাচ্যের বারুদে ঠাসা ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এক নতুন ও ভয়াবহ মোড় নিয়েছে। এতদিন এই সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু লোহিত সাগর আর পারস্য উপসাগরে সীমাবদ্ধ থাকলেও, এবার তার আঁচ লেগেছে উত্তর আফ্রিকার দেশ মিসরের গায়ে। বুধবার (২৯ জুলাই) মিসরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দামিয়েত্তা প্রাকৃতিক গ্যাস বন্দরে এক ভয়াবহ ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। এই আকস্মিক বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ফলে পুরো অঞ্চলে যুদ্ধের এক নতুন ফ্রন্ট বা রণাঙ্গন উন্মোচিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। যদিও এই হামলার চূড়ান্ত লক্ষ্যবস্তু কী ছিল তা নিয়ে রহস্য দানা বেঁধেছে, তবে এখন পর্যন্ত কায়রো প্রশাসন পাল্টা কোনো সামরিক পদক্ষেপের ঘোষণা দেয়নি।

ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ‘অ্যামব্রে’ (Ambrey)-র প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দামিয়েত্তা বন্দরে নোঙর করা একটি বাণিজ্যিক জাহাজে ড্রোনটি সরাসরি আঘাত হানলে মুহূর্তেই প্রলয়ংকরী আগুনের সূত্রপাত হয়। সেই আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে পার্শ্ববর্তী আরেকটি জাহাজেও। পরিস্থিতি মোকাবিলায় বন্দরের ফায়ার সার্ভিস ও উদ্ধারকারী দল দ্রুত কাজ শুরু করে এবং শেষ পর্যন্ত আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। স্বস্তির বিষয় হলো, জাহাজের নাবিকদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং কোনো প্রাণহানির খবর মেলেনি। তবে বিস্ময়করভাবে, এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষই এই দুঃসাহসিক হামলার দায় স্বীকার করেনি, যা আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জন্য এক বড় ধরণের ‘চ্যালেঞ্জ’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একই দিনে মধ্যপ্রাচ্যের অন্য প্রান্তেও চলেছে পেশি শক্তির লড়াই। ইরাকের অভ্যন্তরে সক্রিয় ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিভিন্ন অবস্থানে যৌথ বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের ‘স্মার্ট’ যুদ্ধবিমানগুলো। ইরাকি গ্রুপ ‘পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস’ (পিএমএফ) দাবি করেছে যে, এই হামলায় তাঁদের অন্তত ২০ জন সদস্য নিহত এবং ৩২ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। মূলত সৌদি আরবের তেল স্থাপনা লক্ষ্য করে ইরাক থেকে চালানো ড্রোন হামলার ‘প্যাকেজ’ জবাব দিতেই ওয়াশিংটন ও রিয়াদ এই যৌথ অভিযান পরিচালনা করে। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং হরমুজ প্রণালিতে থাকা আন্তর্জাতিক জাহাজে পাল্টা হামলার কথা অকপটে স্বীকার করে নিয়েছে।

এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মাঝে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত কঠোর ভাষায় ইরানকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, “মার্কিন সেনাদের ওপর কোনো ধরণের আঘাত আর সহ্য করা হবে না; হামলা অব্যাহত থাকলে তেহরানকে এর চরম মাশুল দিতে হবে।” অন্যদিকে, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান তাঁর দেশের জনগণকে শত্রুর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে ঘোষণা করেছেন যে, ইরান কোনো অন্যায়ের কাছে মাথা নত করবে না। এদিকে, রয়টার্সের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী এখন দক্ষিণ লোহিত সাগর দিয়ে যাতায়াতকারী প্রতিটি বাণিজ্যিক জাহাজের কাছ থেকে বিশেষ ‘ট্রানজিট ফি’ বা মাশুল আদায়ের পরিকল্পনা করছে, যা বিশ্ব বাণিজ্যের ‘বাজেট’ ও সরবরাহ শৃঙ্খলে নতুন অস্থিরতা তৈরি করবে।

যুদ্ধের এই সর্বব্যাপী প্রভাব থেকে মুক্ত নয় বৈশ্বিক অর্থনীতিও। বুধবার আন্তর্জাতিক বাজারে ‘ব্রেন্ট ক্রুড’ তেলের দাম একলাফে ৭ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা সাম্প্রতিক মাসগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মুখে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার এবং মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদেলাত্তি টেলিফোনে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন। তাঁরা গাজা ও পশ্চিম তীরের মানবিক বিপর্যয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে অবিলম্বে ‘ডেডলাইন’ মেনে যুদ্ধবিরতি এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুসরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন বারুদের গন্ধে ভারী, যা যেকোনো মুহূর্তে এক মহাপ্রলয়ের সংকেত দিচ্ছে।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।