ইতালির ৮৩তম ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিয়ে এক মিশ্র অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়ে দেশে ফিরেছেন দেশের জনপ্রিয় অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন। সোমবার সকালে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ইতালির মাটিতে নিজের ওপর ঘটা ন্যাক্কারজনক হামলার বিস্তারিত তুলে ধরেন তিনি। এ সময় বিমানবন্দরে মেয়েকে স্বাগত জানাতে উপস্থিত ছিলেন তাঁর বাবা প্রকৌশলী আমিনুল হক।
ভেনিসের মাটিতে হেনস্তার শিকার হওয়ার পরবর্তী পরিস্থিতির বিবরণ দিয়ে বাঁধন জানান, অনাকাঙ্ক্ষিত সেই ঘটনার পর স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন তাঁকে সর্বোচ্চ স্তরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিল। ইতালির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাঁকে টানা ২৪ ঘণ্টা কড়া নিরাপত্তাবলয়ে রাখে। পুলিশ সদস্যরা সার্বক্ষণিক হোটেলের লবিতে সতর্ক পাহারায় নিয়োজিত ছিলেন এবং উৎসব সংশ্লিষ্ট কাজের খাতিরে তিনি যেখানেই বের হতেন, সেখানেই পুলিশি স্কোয়াড তাঁর সঙ্গে থাকত।
আইনি পদক্ষেপের বিষয়ে বাঁধন উল্লেখ করেন, গত ৮ সেপ্টেম্বর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ইতালির পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট এলাকার পুলিশ বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন এবং একই সঙ্গে রোমে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস ও ইতালি সরকারের আন্তরিক ও দায়িত্বশীল সহযোগিতার ভূয়সী প্রশংসা করেন এই অভিনেত্রী।
হামলাকারীদের বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বাঁধন বলেন, যারা বিদেশের মাটিতে অপরকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আক্রমণ করছেন, শেষ পর্যন্ত তাঁরা নিজেরাই চরম আইনি সংকটে পড়ছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, ঘটনাটি দূর থেকে কেবল কটূক্তি, স্লোগান কিংবা পানি ছুড়ে মারার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তাঁর গায়ে সরাসরি হাত তোলা হয়েছিল এবং শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়েছিল। সভ্য সমাজে এমন বর্বরতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং এর দ্রুত অবসান ঘটা প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
রাজনৈতিক অন্ধত্ব বা ‘দলকানা’ মনোভাব পরিহার করার জন্য প্রবাসীদের প্রতি জোরালো আহ্বান জানান বাঁধন। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাবশালী নেতাদের নির্দেশিত অডিও কিংবা ভিডিও বার্তার অন্ধ উসকানিতে জড়িয়ে কোনো ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে প্রবাসীদের জড়ানো অনুচিত। এ ধরনের হঠকারী সিদ্ধান্তের কারণে শেষমেশ সংশ্লিষ্ট প্রবাসীর নিজ পরিবারই বিপদে পড়বে। তিনি মনে করিয়ে দেন, প্রবাসীরা বিদেশে অমানুষিক পরিশ্রম করে দেশে মূল্যবান রেমিট্যান্স পাঠিয়ে অর্থনীতির চাকা সচল রাখছেন; ফলে তাঁদের এই অমূল্য শ্রম কোনো রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষী মহলের প্ররোচনায় নষ্ট করা উচিত নয়।
চলচ্চিত্র উৎসব প্রসঙ্গে জানা যায়, নির্মাতা রুবাইয়াত হোসেন পরিচালিত ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ সিনেমার আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী উপলক্ষে বাঁধন ইতালি সফরে গিয়েছিলেন। বিশ্বখ্যাত ৮৩তম ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হওয়ার পর ছবিটি সম্মানজনক ইনডিপেনডেন্ট ফিল্ম ক্রিটিকস অ্যাওয়ার্ডসের ‘প্রেমিও বিসাতো দ’ওরো’ পুরস্কার অর্জন করে দেশের জন্য গৌরব বয়ে আনে।
তবে সেই উৎসবের মধ্যেই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি ঘটে। গত ৬ সেপ্টেম্বর ঐতিহাসিক সালা দারসেনা থিয়েটারে সিনেমাটির বর্ণাঢ্য বিশ্ব প্রিমিয়ার অনুষ্ঠিত হয়। প্রিমিয়ার শেষে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অবকাশযাপনে বের হলে আকস্মিকভাবে হামলা ও হেনস্তার মুখে পড়েন বাঁধন। তাঁর অভিযোগ অনুযায়ী, দলবদ্ধ কিছু ব্যক্তি তাঁর দিকে বোতল থেকে পানি ও কোমলপানীয় ছুড়ে মারে, শারীরিকভাবে হেনস্তা করে এবং হাত থেকে জোরপূর্বক তাঁর স্মার্টফোনটি ফেলে দেয়। এ সময় অভিনেত্রীর সঙ্গে তাঁর ভাইয়ের স্ত্রী এবং মাত্র তিন বছর বয়সী এক শিশুসন্তানও উপস্থিত ছিল।
অভিযুক্ত ব্যক্তিদের পরিচয় প্রসঙ্গে বাঁধন জানান, হামলাকারীদের কয়েকজন নিজেদের তৎকালীন আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ নেতাকর্মী এবং ‘বঙ্গবন্ধুর সৈনিক’ বলে দাবি করেছিল। ইতালির মাটিতে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের এক শিল্পীর ওপর এমন কাপুরুষোচিত হামলার খবর দেশে পৌঁছালে শোবিজ অঙ্গনের বহু তারকা ও সংস্কৃতিকর্মী তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং বাঁধনের প্রতি সংহতি জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড় তোলেন।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।