মুম্বাইয়ের ঘিঞ্জি টিন বাত্তি এলাকার একটি সাধারণ চাওল। যেখানে মাত্র ১০ বাই ১০ ফুটের একটি ছোট্ট কামরায় দমবন্ধ করা পরিবেশে যৌথ পরিবারের সঙ্গে শৈশব-কৈশোর কেটেছে তাঁর। এক চিলতে ঘরে জায়গা ভাগাভাগি করে যে ছেলেটি বড় হয়েছিল, ভাগ্যের চাকা ঘুরে একসময় তিনিই হয়ে ওঠেন বলিউডের শীর্ষ জনপ্রিয় সুপারস্টারদের একজন। খ্যাতি, অগাধ বিত্ত-বৈভব, রাজকীয় বাংলো আর বিলাসবহুল গাড়ি—সবকিছুই ধরা দিয়েছিল তাঁর জীবনে। কিন্তু ভুল এক বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তের খেসারত দিতে গিয়ে সেই সচ্ছলতার চূড়া থেকে হঠাৎই চরম আর্থিক সংকটের অতল গহ্বরে আছড়ে পড়েন তিনি। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিল যে দেনার দায়ে ঘরের আসবাবপত্র এমনকি শেষ সম্বল বাড়িটিও বিক্রি করে নিঃস্ব হতে হয়েছিল তাঁকে।
বলিউডের চিরসবুজ অভিনেতা জ্যাকি শ্রফের জীবন কেবল দারিদ্র্য জয় করে সেলিব্রিটি হয়ে ওঠার গল্প নয়; এটি সীমাহীন সাফল্য, আকস্মিক পতন এবং ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখির মতো ফের ঘুরে দাঁড়ানোর এক অনন্য জীবনসংগ্রাম। সম্প্রতি একাধিক জাতীয় গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নিজের বর্ণাঢ্য জীবনের সেই করুণ ও অনুপ্রেরণাদায়ী দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করেছেন এই প্রবীণ অভিনেতা।
টিন বাত্তির সাধারণ চাওলে এক জ্যোতিষী পিতার ঘরে জন্ম নেওয়া জ্যাকির জীবনের প্রথম ৩৩টি বছর কেটেছে ওই খুপরির মতো ১০ বাই ১০ ফুটের ঘরেই। এমনকি রূপালি পর্দার অভিনেতা হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার পরও বেশ কিছুদিন তাঁকে সেখানেই বসবাস করতে হয়েছে। চাওলের জীবন ছিল অতি সাধারণ ও সংগ্রামের; শৌচাগার ব্যবহারের জন্য ভোরবেলা লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হতো। জীবনের শুরুর বছরগুলোতে সকালের শুটিংয়ে যাওয়ার আগে কিংবা কাজ শেষে ফিরে এই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হতো জ্যাকিকে। তবে অর্থ উপার্জনের শুরু থেকেই জ্যাকি শ্রফের অদ্ভুত এক গাড়ির শখ ছিল। কিন্তু অর্থ জমিয়ে রাখার চেয়ে বন্ধু-বান্ধব, পরিবার এবং অভাবী মানুষকে দুহাত ভরে দান করতেই তিনি বেশি ভালোবাসতেন। নিজের ভাষায়, টাকা হাতে এলেই বিলিয়ে দেওয়ার কারণে পর্যাপ্ত উপার্জন করলেও তাঁর কোনো সঞ্চয় ছিল না।
মডেলিংয়ের মাধ্যমে আলো ছড়ানোর সময় কিংবদন্তি অভিনেতা দেব আনন্দের সুনজরে পড়েন জ্যাকি শ্রফ। ১৯৮২ সালে দেব আনন্দের ‘স্বামী দাদা’ চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে রূপালি পর্দায় অভিষেক ঘটে তাঁর। এর ঠিক পরের বছর, ১৯৮৩ সালে প্রখ্যাত নির্মাতা সুভাষ ঘাইয়ের ব্লকবাস্টার সিনেমা ‘হিরো’ তাঁকে রাতারাতি তারকাখ্যাতি এনে দেয়। এই সাফল্যের পর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। রোমান্স, মারকাটারি অ্যাকশন থেকে শুরু করে পারিবারিক গল্প—সব চরিত্রেই নিজের জাত চিনিয়ে আশির ও নব্বইয়ের দশকে বলিউডের অন্যতম শীর্ষ পারিশ্রমিক পাওয়া অভিনেতায় পরিণত হন তিনি।
তারকা হওয়ার পর বিপুল আয় করলেও নিজস্ব কোনো স্থায়ী বাড়ি কেনার পরিকল্পনা শুরুতে জ্যাকির ছিল না। তাঁর এমন উদাসীনতায় উদ্বিগ্ন ছিলেন মা। ‘স্বামী দাদা’ সিনেমার সহ-অভিনেতা শক্তি কাপুর তখন জ্যাকিকে বোঝান যে শুধু অর্থ বিলিয়ে দিলেই চলবে না, পরিবারের নিরাপত্তার জন্য নিজের একটি বাড়ি থাকা আবশ্যক। পরবর্তীতে জ্যাকি জানান, প্রথম বাড়িটি কেনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন তাঁর স্ত্রী আয়েশা শ্রফ। বিমানবাহিনীর সাবেক এয়ার ভাইস মার্শালের মেয়ে আয়েশা অত্যন্ত সচ্ছল পরিবারের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও জ্যাকির সংগ্রামের দিনগুলোতে পরম বিশ্বস্ততায় পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। এমনকি চাওলের কঠিন জীবনের সঙ্গেও মানিয়ে নিয়েছিলেন তিনি। পরবর্তীতে স্বামীকে নিজস্ব বাড়ি কিনে দিতে আয়েশা নিজের ব্যক্তিগত বাড়ি বিক্রি করে দেন। আর এর মধ্য দিয়েই ছোট চাওল ছেড়ে মুম্বাইয়ে বড় বাড়ির মালিক হয়ে স্বপ্নপূরণ করেন জ্যাকি।
তবে ২০০৩ সালে একটি ভুল প্রযোজনা সিদ্ধান্ত সবকিছু তছনছ করে দেয়। কাইজাদ গুস্তাদের পরিচালনায় এবং স্ত্রী আয়েশা শ্রফের প্রযোজনায় নির্মিত হয় বহুল আলোচিত ছবি ‘বুম’। ছবিতে অমিতাভ বচ্চন, জ্যাকি শ্রফ, গুলশন গ্রোভার, জিনাত আমান, পদ্মা লক্ষ্মী এবং নবাগতা ক্যাটরিনা কাইফ অভিনয় করেন। এই ছবির মাধ্যমেই বলিউডে ক্যাটরিনার অভিষেক হয়। বড় প্রত্যাশা থাকলেও মুক্তির পরই বক্স অফিসে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়ে বিগ বাজেটের এই সিনেমা। আর এতেই বিপুল ঋণের বোঝায় পিষ্ট হয়ে যায় শ্রফ পরিবার। জ্যাকি স্পষ্ট জানিয়েছেন, ব্যবসায় লাভ-ক্ষতি থাকবেই; কিন্তু কারও দেনা মাথায় নিয়ে পরিবারকে কলঙ্কিত দেখতে চাননি তিনি। তাই যেকোনো মূল্যে দেনা শোধ করার কঠিন পণ নেন তিনি।
সেই ঋণ পরিশোধের ভয়াবহ নির্মম চিত্র ২০১৯ সালে এক সাক্ষাৎকারে প্রকাশ করেছিলেন জ্যাকির পুত্র ও অভিনেতা টাইগার শ্রফ। শৈশবের স্মৃতি রোমন্থন করে টাইগার জানান, দেনার দায় মেটাতে তাঁদের ঘরের আসবাবপত্র একে একে বিক্রি হয়ে যাচ্ছিল। ছোটবেলা থেকে ঘরে যেসব চেনা জিনিস দেখে বড় হয়েছিলেন, সেগুলো চোখের সামনে উধাও হয়ে যাচ্ছিল। এমন এক পর্যায়ে পরিস্থিতি পৌঁছায় যখন ঘুমানোর বিছানা পর্যন্ত বিক্রি করে দেওয়া হয় এবং টাইগারকে মেঝেতে ঘুমাতে হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত পরিবারকে বাঁচাতে বান্দ্রার চার শয্যার বিলাসবহুল ফ্ল্যাটটি বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন জ্যাকি শ্রফ। এরপর সেখান থেকে সরে গিয়ে পরিবার নিয়ে খার এলাকার একটি ছোট দুই শয্যার বাড়িতে ভাড়াটিয়া হিসেবে ওঠেন তিনি।
বাবার তারকাদ্যুতির আড়ালে এমন চরম অর্থকষ্ট টাইগারের মনে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছিল। পরবর্তীতে টাইগার প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, একদিন তিনি হারানো সেই বাড়িটি পুনরায় কিনে বাবা-মাকে উপহার দেবেন। কিন্তু জ্যাকি ও আয়েশা সেই পুরোনো বাড়ি ফিরে পাওয়ার বিষয়ে আর কোনো আগ্রহ দেখাননি। আয়েশার স্পষ্ট দর্শন ছিল—"যা চলে গেছে, তা চলে গেছে।"
চরম বিপর্যয় সত্ত্বেও জ্যাকি শ্রফ কখনো ভেঙে পড়েননি বা কাউকে দোষারোপ করেননি। দেনা পরিশোধ করতে দিনরাত এক করে হিন্দি সিনেমার পাশাপাশি বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষার চলচ্চিত্র ও বৈচিত্র্যময় চরিত্রে অভিনয় করতে থাকেন তিনি। অভিনেতার দৃঢ় বিশ্বাস—টাকা হারানো জীবনের সমাপ্তি নয়, বরং যেকোনো পরিস্থিতিতে ঘুরে দাঁড়ানোর মানসিকতাই আসল। কঠোর পরিশ্রম আর অধ্যবসায়ে জ্যাকি শ্রফ শুধু দেনামুক্তই হননি, বরং নিজেকে নতুন করে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বর্তমানে মুম্বাইয়ে বিলাসবহুল নিজস্ব আবাসের পাশাপাশি মুম্বাই-পুনের মধ্যবর্তী মনোরম পাহাড়ি অঞ্চলে প্রায় ৪৪ হাজার বর্গফুটের একটি সুবিশাল আধুনিক ফার্মহাউসের মালিক জ্যাকি।
এত প্রাচুর্যের মাঝেও টিন বাত্তির সেই ১০ বাই ১০ ফুটের চাওলকে কখনো বিস্মৃত হননি জ্যাকি শ্রফ। জীবনের সোনালি ৩৩টি বছর সেখানে কাটানো অভিনেতা স্মৃতি ধরে রাখতে সেই পুরোনো কামরাটি পুনরায় ভাড়া নেওয়ার ইচ্ছাও প্রকাশ করেছিলেন। বাড়ির বর্তমান মালিক রাজি না হওয়ায় সেটি সম্ভব না হলেও, জ্যাকি প্রায়ই মাঝেমধ্যে নিভৃতে সেই পুরোনো চাওলে ছুটে যান, বারান্দায় দাঁড়িয়ে ফেলে আসা ফেলে দেওয়া দিনগুলোর দিকে ফিরে তাকান।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।