বিশ্বজুড়ে ব্যক্তিগত কম্পিউটিং ডিভাইসের বাজারে দীর্ঘ স্থবিরতা কাটিয়ে আবারও দাপট দেখাতে শুরু করেছে ট্যাবলেট। বিশেষ করে ২০২৫ সালে এই খাতের ব্যবসায় এক বিশাল ইতিবাচক পরিবর্তনের জোয়ার লক্ষ্য করা গেছে। আন্তর্জাতিক বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ওমডিয়া’ (Omdia)-র সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এক বছরে বৈশ্বিক বাজারে ট্যাবলেট সরবরাহের পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় ৯ দশমিক ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের নজর কেড়েছে।
ওমডিয়ার পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালে সারা বিশ্বে মোট ১৬ কোটি ২০ লাখ ইউনিট ট্যাবলেট বাজারজাত করা হয়েছে। এর মধ্যে বছরের শেষ তিন মাস অর্থাৎ অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের ‘হলিডে কোয়ার্টার’-এ বিক্রির হার ছিল সবচেয়ে চমকপ্রদ। এই উৎসবের মৌসুমে বিশ্বজুড়ে সরবরাহ করা হয়েছে প্রায় ৪ কোটি ৪০ লাখ ইউনিট ট্যাবলেট। বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক শিক্ষা কার্যক্রম এবং দাপ্তরিক কাজে ট্যাবলেটের বহুমুখী ব্যবহারের পাশাপাশি এতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘এআই’ (AI) প্রযুক্তির সংযোজন গ্রাহকদের নতুন করে এই ডিভাইসের প্রতি আগ্রহী করে তুলেছে। বড় স্ক্রিনে প্রোডাক্টিভিটি অ্যাপ ব্যবহারের সুবিধা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহজলভ্যতা এই প্রবৃদ্ধিতে জ্বালানি হিসেবে কাজ করেছে।
আঞ্চলিক প্রবৃদ্ধির বিচারে গত বছর সবচেয়ে বড় চমক দেখিয়েছে মধ্য ও পূর্ব ইউরোপ। ওমডিয়ার তথ্যমতে, এই অঞ্চলটি গত বছর বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল ট্যাবলেট বাজার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। প্রবৃদ্ধির এই দৌড়ে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল। উত্তর আমেরিকা বাদে বিশ্বের প্রায় প্রতিটি বাজারেই গত বছর ট্যাবলেটের চাহিদা ঊর্ধ্বমুখী ছিল। যদিও উত্তর আমেরিকার বার্ষিক হিসেবে সামান্য মন্দা লক্ষ্য করা গেছে, তবে বছরের শেষ ভাগের ‘হলিডে সিজন’ সেই ঘাটতি অনেকটাই পুষিয়ে দিয়েছে। নামী নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ও খুচরা বিক্রেতাদের আকর্ষণীয় ‘বাজেট-ফ্রেন্ডলি’ অফার ও মূল্যছাড়ের কারণে বছরের শেষ প্রান্তে গ্রাহকদের ভিড় ছিল লক্ষণীয়।
ওমডিয়ার রিসার্চ ম্যানেজার হিমানি মুক্কা বলেন, ‘২০২০ সালে মহামারীর প্রভাবে ট্যাবলেট খাতে যে বিশাল চাহিদা তৈরি হয়েছিল, তারপর কেবল ২০২৫ সালে এসে আমরা সবচেয়ে বড় বার্ষিক প্রবৃদ্ধি দেখতে পাচ্ছি।’ এই সাফল্যের নেপথ্যে তিনি দুটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন—প্রথমত, উৎসবকেন্দ্রিক কেনাকাটার ব্যাপক জোয়ার এবং দ্বিতীয়ত, ভবিষ্যতে ‘মেমোরি চিপ’-এর সম্ভাব্য সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কায় বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো আগেভাগেই প্রচুর পরিমাণে পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিত করে রেখেছিল।
তবে ২০২৫ সালের এই সুবাতাস স্থায়ী না-ও হতে পারে বলে সতর্কবার্তা দিয়েছেন হিমানি মুক্কা। তার মতে, চলতি বছর ট্যাবলেটের বাজারে চাহিদার ওপর প্রবল চাপ তৈরি হতে পারে। বৈশ্বিক বাজারে মেমোরি চিপের দুষ্প্রাপ্যতা এবং উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার ফলে নির্মাতাদের জন্য বাজারের প্রতিযোগিতা ও মুনাফার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে। ফলে নতুন বছরে প্রবৃদ্ধির এই ধারা ধরে রাখা হবে এক বিশাল চ্যালেঞ্জ।
মূলত ল্যাপটপের চেয়ে হালকা ও বহনযোগ্য হওয়ায় ভ্রমণ, ক্লাসরুম কিংবা অফিসে যাতায়াতের পথে ট্যাবলেট ব্যবহারের সুবিধা অনস্বীকার্য। আবার স্মার্টফোনের তুলনায় বড় স্ক্রিনে ভিডিও স্ট্রিমিং, ই-বুক পড়া বা গেমিং করার অভিজ্ঞতা অনেক বেশি আরামদায়ক। বিশেষ করে অনলাইন ক্লাস ও হাইব্রিড ওয়ার্ক কালচারের কারণে ট্যাবলেট এখন আধুনিক জীবনযাত্রার এক অপরিহার্য অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।