বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলরাশি ও এর তলদেশে লুকিয়ে থাকা অমূল্য মৎস্যসম্পদকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের ‘নীল অর্থনীতি’ বা ‘ব্লু ইকোনমি’র যে উজ্জ্বল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তা বাস্তবায়নে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে মাছের সঠিক প্রজাতি শনাক্তকরণে আমাদের সীমাবদ্ধতা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে সবার আগে বৈজ্ঞানিকভাবে মাছের শ্রেণিবিন্যাস বা ট্যাক্সোনমি নিশ্চিত করতে হবে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ‘সমুদ্র সাক্ষরতা’র প্রসার ঘটাতে হবে।
গতকাল রোববার বিকেলে কক্সবাজার শহরের ঝাউতলায় অবস্থিত ‘রেডিয়েন্ট ফিশওয়ার্ল্ড’-এর সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত এক আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সেমিনারে এসব গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়। ‘বিজ্ঞান ও সমাজের মধ্যে সেতুবন্ধন: সামুদ্রিক মৎস্যের উন্নত শ্রেণিবিন্যাস ও সমুদ্র সাক্ষরতার মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক টেকসই নীল অর্থনীতি’ শীর্ষক এই সেমিনারের আয়োজন করে রেডিয়েন্ট ওশান রিসার্চ অ্যান্ড এডুকেশন সেন্টার (আরওআরইসি)।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে কক্সবাজার সামুদ্রিক মৎস্য গবেষণা কেন্দ্রের (বিএফআরআই) বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আকতারুজ্জামান শাকিল সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, “বঙ্গোপসাগর সম্পদের এক বিশাল ভান্ডার হওয়া সত্ত্বেও আমরা যদি প্রজাতিগুলো সঠিকভাবে শনাক্ত করতে না পারি, তবে কোন প্রজাতি বিলুপ্তপ্রায় আর কোনটি সংরক্ষণের প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, ভুল শনাক্তকরণের ফলে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ মোসলেম উদ্দিন ‘সমুদ্র সাক্ষরতা’ বা ‘ওশান লিটারেসি’র গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে বলেন, এটি কেবল পুঁথিগত জ্ঞান নয়, বরং সমুদ্র কীভাবে আমাদের অর্থনীতি ও পরিবেশকে প্রভাবিত করছে তা বোঝার একটি দৃষ্টিভঙ্গি। সমাজের সর্বস্তরের মানুষ সমুদ্রের গুরুত্ব অনুধাবন করলে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ১৪ নম্বর লক্ষ্য অর্থাৎ ‘জলজ জীবনের সংরক্ষণ’ অর্জন অনেক সহজ হবে।
উন্নত প্রযুক্তির প্রয়োগ নিয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় সামুদ্রিক মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (সিএমএফআরআই) সিনিয়র বিজ্ঞানী ড. সুবল কুমার রাওল আধুনিক ট্যাক্সোনমির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি জানান, বর্তমানে শুধু বাহ্যিক অবয়ব দেখে নয়, বরং ‘ডিএনএ বারকোডিং’ (DNA Barcoding), ‘মরফোমেট্রিকস’ (Morphometrics) এবং ‘মলিকিউলার ফাইলোজেনি’র (Molecular Phylogeny) মতো উন্নত জিনগত কোড বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রজাতি শনাক্ত করা হচ্ছে। এই আধুনিক পদ্ধতিগুলো ব্যবহার করে সাগরের আক্রমণাত্মক প্রজাতি নিয়ন্ত্রণ এবং মৎস্যসম্পদ আহরণের একটি বিজ্ঞানসম্মত ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করা সম্ভব।
বাণিজ্যিক গুরুত্বের দিকটি তুলে ধরে মৎস্য অধিদপ্তরের কাঁকড়া হ্যাচারির ব্যবস্থাপক মো. এনায়েত উল্লাহ বলেন, কাঁকড়াসহ উচ্চমূল্যের রপ্তানিযোগ্য মাছের সঠিক শ্রেণিবিন্যাস না জানা থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি ও উৎপাদনে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়। বেসরকারি খাতে গবেষণার সুযোগ বাড়ানোর দাবি জানান প্রকৌশলী মামুনুর রশিদ ও রেডিয়েন্ট ফিশওয়ার্ল্ডের ব্যবস্থাপক নুরুজ্জামান নয়ন।
সেমিনারের সভাপতি এবং আরওআরইসির এক্সিকিউটিভ ও রিসার্চ অফিসার মো. আবদুল কাইয়ুম তাঁর বক্তব্যে জানান, তাঁদের লক্ষ্য কেবল তাত্ত্বিক গবেষণা নয়, বরং গবেষণার ফলাফলগুলো জেলে, নতুন উদ্যোক্তা এবং শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। কক্সবাজারে একটি পূর্ণাঙ্গ সামুদ্রিক শিক্ষা ও গবেষণাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার পাশাপাশি তারা একটি সমৃদ্ধ ‘বঙ্গোপসাগর মৎস্য ডেটাবেজ’ তৈরির কাজ শুরু করছেন।
সেমিনারে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক, শিক্ষার্থী, মৎস্য খাতের সফল উদ্যোক্তা এবং গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন, যা বিজ্ঞান ও সাধারণ সমাজের মধ্যে এক নতুন সেতুবন্ধন তৈরির ইঙ্গিত দেয়।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।