যুক্তরাষ্ট্রের নবনিযুক্ত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক আকস্মিক ও অত্যন্ত কঠোর নির্দেশনায় বড় ধরনের অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়েছে জনপ্রিয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘অ্যানথ্রপিক’ (Anthropic)। জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে ট্রাম্প সরকার দেশের সকল সরকারি সংস্থাকে এই প্রতিষ্ঠানের সাথে সব ধরনের কাজ বন্ধের কড়া নির্দেশ দিয়েছেন। এর পাশাপাশি পেন্টাগন আনুষ্ঠানিকভাবে অ্যানথ্রপিককে ‘সাপ্লাই চেইন রিক্স’ (Supply Chain Risk) বা সরবরাহ শৃঙ্খলের জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যা বিশ্ব প্রযুক্তি বাজারে এক নজিরবিহীন এবং ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গত শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) জারি করা ওই বিশেষ নির্দেশনায় বলা হয়েছে, প্রতিরক্ষা দপ্তরসহ সকল সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে আগামী ছয় মাসের ‘ডেডলাইন’ বা সময়সীমার মধ্যে অ্যানথ্রপিকের প্রযুক্তি ও পরিষেবা ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। এই রূপান্তর বা স্থানান্তর প্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠানটি যদি কোনো প্রকার অসহযোগিতা করে, তবে প্রেসিডেন্ট তাঁর নির্বাহী ক্ষমতার পূর্ণ প্রয়োগ করবেন বলে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। ট্রাম্প আরও যোগ করেন যে, নির্দেশের বরখেলাপ হলে প্রয়োজনে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর বেসামরিক ও ফৌজদারি আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, গুগল ও অ্যামাজনের মতো বিশ্ববিখ্যাত প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ থাকা অ্যানথ্রপিকের জন্য এটি একটি অপূরণীয় ক্ষতি। এতদিন ধরে জাতীয় নিরাপত্তার উন্নত এআই সক্ষমতা অর্জনে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রযুক্তিগতভাবে এগিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছিল এই প্রতিষ্ঠানটি। তবে সম্প্রতি পেন্টাগনের এক বৈঠকে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই এবং মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ দেখা দেয়। আমোদেই অস্ত্র ব্যবস্থায় এআই ব্যবহারের একটি সুনির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ এবং গণনজরদারি বন্ধের ব্যাপারে তাঁর সতর্ক অবস্থানের কথা জানান। এর জবাবে পেন্টাগনের অবস্থান ছিল অত্যন্ত অনমনীয়; তাদের মতে, দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কীভাবে পরিচালিত হবে তা নির্ধারণ করবে রাষ্ট্রীয় আইন, কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নয়।
পেন্টাগনের এই ‘সাপ্লাই চেইন রিক্স’ ঘোষণার ফলে হাজার হাজার ঠিকাদার ও সহযোগী প্রতিষ্ঠান এখন অ্যানথ্রপিকের এআই ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হবে। একজন সরকারি চুক্তি বিশেষজ্ঞ এই পরিস্থিতিকে ‘চুক্তিভিত্তিক পারমাণবিক আঘাত’-এর সাথে তুলনা করেছেন, যা মূলত কোনো প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। ইতিপূর্বে চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়েকে পেন্টাগনের সরবরাহ শৃঙ্খল থেকে বাদ দিতে ঠিক একই ধরনের কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। ঠিক এমন উত্তপ্ত পরিস্থিতিতেই ‘ওপেনএআই’ (OpenAI) ঘোষণা করেছে যে, তারা প্রতিরক্ষা দপ্তরের গোপন নেটওয়ার্কে এআই প্রযুক্তি সরবরাহের বড় একটি চুক্তি সম্পন্ন করেছে। ওপেনএআই-এর প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান দাবি করেছেন, তাঁদের চুক্তিতে অস্ত্র ব্যবস্থায় মানবিক দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার বিষয়টি সুনিশ্চিত করা হয়েছে।
বর্তমান এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে অ্যানথ্রপিকের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এখন গভীর অনিশ্চয়তার মুখে। প্রতিষ্ঠানটি শীঘ্রই শেয়ারবাজারে তাদের প্রাথমিক শেয়ার বা আইপিও (IPO) ছাড়ার পরিকল্পনা করছিল, যা এখন কার্যত ভেস্তে যেতে পারে। অ্যানথ্রপিক কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যেই এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, তারা পেন্টাগনের এই ঝুঁকি ঘোষণাকে আদালতে চ্যালেঞ্জ করবে। তবে হোয়াইট হাউসের এই কঠোর অবস্থান সিলিকন ভ্যালির এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এক নতুন স্নায়ুযুদ্ধের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।