মধ্যপ্রাচ্যের বারুদে ঠাসা ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পর্দার আড়ালে এক অবিশ্বাস্য ও কৌশলী চাল চেলেছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির। ইসরায়েলভিত্তিক প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘দ্য টাইমস অব ইসরায়েল’-এর এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, সৌদি আরবকে ইরানের সম্ভাব্য হামলা থেকে রক্ষা করতে নেপথ্যে থেকে অত্যন্ত শক্তিশালী মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করেছেন জেনারেল মুনির। এই নজিরবিহীন সমঝোতাটি সম্ভব হয়েছে মূলত ইরান ও পাকিস্তানের মধ্যে পরিচালিত একটি গোপন ‘যৌথ তেল পরিবহন’ উদ্যোগকে দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার মাধ্যমে।
প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্যের সপক্ষে সংশ্লিষ্ট তিন কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক একজন জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক, একটি আঞ্চলিক গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তা এবং এই বিষয়ের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত একজন ব্যক্তি জানিয়েছেন যে, গত মার্চের শেষ দিকে যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাতের পারদ তুঙ্গে ছিল, ঠিক তখনই এই গোপন সমঝোতাটি চূড়ান্ত হয়। সেই সময়ে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশ ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ‘রেড জোন’ বা উচ্চ ঝুঁকিতে থাকলেও, জেনারেল আসিম মুনিরের মধ্যস্থতার পর রিয়াদ কার্যত এই ভয়াবহ বিপদ থেকে সুরক্ষা পায়।
তদন্তমূলক এই প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, গত বছরের শেষ ভাগ থেকে ইরান ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি বিশেষ তেল পরিবহন প্রকল্প বা ‘ইনিশিয়েটিভ’ শুরু হয়েছে। এই উচ্চপর্যায়ের প্রকল্পের সাথে সরাসরি যুক্ত রয়েছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির এবং ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) প্রধান আহমাদ ভাহিদি। বিস্ময়কর বিষয় হলো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও ‘প্যাকেজ’ অবরোধের মধ্যেও এই যৌথ উদ্যোগ থেকে উভয় পক্ষই বিপুল পরিমাণ আর্থিক সুবিধা অর্জন করছে। মূলত এই অর্থনৈতিক স্বার্থকেই কূটনীতির ‘লিভারেজ’ হিসেবে ব্যবহার করেছেন পাকিস্তানি সেনাপ্রধান।
কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, দীর্ঘ তিন মাস সৌদি আরবের দিকে কোনো হামলা না হলেও গত সপ্তাহান্তে তেহরান একটি পরীক্ষামূলক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করলে পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। খবর পাওয়া মাত্রই জেনারেল আসিম মুনির ‘স্মার্ট’ ও দ্রুত পদক্ষেপ হিসেবে আহমাদ ভাহিদিকে এক কড়া সতর্কবার্তা পাঠান। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, সৌদি আরবের ওপর এ ধরণের হামলা অব্যাহত থাকলে দুই দেশের মধ্যকার লাভজনক ‘অয়েল ডিল’ বা যৌথ ব্যবসা চিরতরে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এই বার্তার পরই সৌদি আরবের দিকে ধাবিত হওয়া সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র হামলাগুলো অলৌকিকভাবে বন্ধ হয়ে যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই সূক্ষ্ম মধ্যস্থতার মাধ্যমে পাকিস্তান মূলত সৌদি আরবের সাথে তাদের কৌশলগত সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছে। ইসলামাবাদের মূল লক্ষ্য হলো রিয়াদকে এমন একটি অবস্থানে নিয়ে আসা, যেখানে তারা আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পাকিস্তানের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এই ‘হাই-ভোল্টেজ’ গোপন সমঝোতা কেবল মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের গতিপথকেই প্রভাবিত করেনি, বরং দক্ষিণ এশিয়ার সাথে আরব বিশ্বের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের নতুন এক ‘রোডম্যাপ’ তৈরি করেছে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।