নিজের ঘরেই রহস্যময় বন্দিত্ব: নেটফ্লিক্সে ঝড় তুলেছে ‘দ্য লাস্ট হাউস’

একটি সাধারণ বাড়ি, অথচ চারপাশ থেকে সেটি যেন এক দুর্ভেদ্য কারাগার। বাইরে অবিরাম বৃষ্টির ঝাপটা, কিন্তু সেই বৃষ্টির ধরনে রয়েছে এক অদ্ভুত রহস্য। দরজা খোলার সাধ্য নেই, জানালাগুলোও যেন কোনো এক অদৃশ্য শক্তি আটকে রেখেছে। স্মার্টফোন থেকে শুরু করে ইন্টারনেট—যোগাযোগের সব আধুনিক মাধ্যমই অকেজো। এমন এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির মুখে দাঁড়িয়ে চারজন মানুষ বুঝতে পারে, তারা কেবল নিজেদের ঘরেই আটকা পড়েনি, সম্ভবত পুরো পৃথিবী থেকেই তারা চিরতরে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ঠিক এমনই এক গা শিউরে ওঠা প্রেক্ষাপটে নির্মিত হয়েছে নেটফ্লিক্সের নতুন হরর-সায়েন্স ফিকশন চলচ্চিত্র ‘দ্য লাস্ট হাউস’।

গত ৭ আগস্ট ওটিটি প্ল্যাটফর্মে মুক্তির পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবিটি নিয়ে চলছে তুমুল আলোচনা ও বিশ্লেষণ। দর্শকদের কেউ কেউ ছবিটির অস্বস্তিকর গুমোট পরিবেশ এবং শেষ পর্যন্ত রহস্য ধরে রাখার কৌশলে মুগ্ধ হয়েছেন। আবার সমালোচকদের একাংশ মনে করছেন, দারুণ একটি মৌলিক ধারণাকে দূর্বল চিত্রনাট্যের কারণে শেষ পর্যন্ত পূর্ণতা দেওয়া সম্ভব হয়নি।

ছবিটির প্রধান দুই চরিত্রে অভিনয় করেছেন বর্তমান সময়ের প্রভাবশালী দুই অভিনয়শিল্পী। ‘পাস্ট লাইভস’ খ্যাত অভিনেত্রী গ্রেটা লি এবং ‘নার্কোস’-এর পাবলো এসকোবার চরিত্রে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তা পাওয়া অভিনেতা ওয়াগনার মৌরা। ছবিটি পরিচালনা করেছেন লুই লেতেরিয়ের, যাঁর ঝুলিতে ‘দ্য ইনক্রেডিবল হাল্ক’, ‘নাউ ইউ সি মি’ এবং ‘ফাস্ট এক্স’-এর মতো হাই-বাজেট ও অ্যাকশন নির্ভর সিনেমার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তবে এবার তিনি হেঁটেছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে। বিশাল কোনো লোকেশন বা বড় বাজেটের সেটের বদলে পুরো গল্পকে আটকে ফেলেছেন চার দেয়ালের সীমাবদ্ধতায়।

গল্পের বুনন ও সংকট
গল্পের কেন্দ্রে রয়েছেন রাইলি (গ্রেটা লি) ও জেসন (ওয়াগনার মৌরা) দম্পতি। দুই সন্তানকে নিয়ে তাঁদের স্বাভাবিক জীবনে হঠাৎ নেমে আসে এক ব্যাখ্যাতীত বিপর্যয়। তাঁরা আবিষ্কার করেন, বাইরের জগতের সঙ্গে তাঁদের সব যোগসূত্র বিচ্ছিন্ন এবং বাড়িটি থেকে বের হওয়ার কোনো পথ নেই। সেই রহস্যময় বৃষ্টির মাঝে লুকিয়ে থাকা কোনো শক্তি যেন তাঁদের ওপর নজরদারি করছে। শুরুতে সাধারণ কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয় মনে হলেও, সময় যত গড়ায়, তাঁদের মধ্যকার আতঙ্ক তত তীব্র হয়ে ওঠে। ফুরিয়ে আসতে থাকে মজুত খাবার, বাড়ে অনিশ্চয়তা।

এই ছবির সবচেয়ে বড় বাঁক বা ‘টুইস্ট’ আসে গল্পের মাঝামাঝি সময়ে। দর্শকরা লক্ষ্য করেন, এই বন্দিত্ব কেবল কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহের নয়; বরং গল্প এক লাফে কয়েক বছর সামনে এগিয়ে যায়। বছরের পর বছর একটি আবদ্ধ জায়গায় থাকার ফলে চরিত্রগুলোর মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন এবং তাঁদের বেঁচে থাকার সংগ্রাম ছবিটিকে এক নতুন উচ্চতা দেয়। এরই মাঝে বাইরে থেকে এক আগন্তুকের আগমন ঘটে, যা দর্শকদের মনে নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়—যদি পৃথিবী জনশূন্য হয়ে থাকে, তবে এই মানুষটি এল কোথা থেকে? সে কি ত্রাতা, নাকি কোনো আসন্ন মহাবিপদের সংকেত?

হরর নাকি মনস্তাত্ত্বিক ড্রামা?
নেটফ্লিক্স ছবিটিকে সায়েন্স ফিকশন এবং থ্রিলার হিসেবে ট্যাগ দিলেও, সমালোচকদের মতে এটি আসলে একটি গভীর ফ্যামিলি ড্রামা। ছবিটিতে অতিপ্রাকৃত উপাদানের চেয়ে বন্দি অবস্থায় পরিবারের সদস্যদের মধ্যকার সম্পর্কের টানাপোড়েন, ক্ষুধা ও মৃত্যুর ভয়কে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। মা হিসেবে গ্রেটা লির অভিনয় অত্যন্ত সাবলীল এবং শক্তিশালী। সন্তানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং একই সঙ্গে নিজের ভয়কে আড়াল করার যে দ্বান্দ্বিকতা, তা তিনি নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। অন্যদিকে, পরিস্থিতির কূলকিনারা করতে চাওয়া একজন অসহায় বাবার চরিত্রে ওয়াগনার মৌরার অভিনয় ছিল পরিমিত।

সমালোচনা ও প্রচারণা
ছবিটির প্রতি দর্শকদের কৌতূহল থাকলেও রিভিউ স্কোর খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। রটেন টম্যাটোজে এর স্কোর এখন পর্যন্ত ৩০-৩৫ শতাংশের ঘরে ঘুরপাক খাচ্ছে। চিত্রনাট্যের অসংগতি এবং রহস্যের অতৃপ্তিদায়ক সমাধানই মূলত এই নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার কারণ। তবে প্রচারণার ক্ষেত্রে নেটফ্লিক্স দেখিয়েছে মুন্সিয়ানা। সানসেট বুলেভার্ডে একটি বিলবোর্ডের ভেতরে লতাপাতায় ঘেরা বাড়ির আদলে একজন মানুষকে তিন দিন আটকে রেখে অভিনব এক প্রচার কৌশল চালানো হয়েছিল, যা বিশ্বজুড়ে সংবাদ শিরোনাম হয়েছে।

সব মিলিয়ে, ‘দ্য লাস্ট হাউস’ দর্শকদের মধ্যে এক মিশ্র অনুভূতির জন্ম দিয়েছে। কেউ একে দেখছেন সময়ের শ্রেষ্ঠ মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলার হিসেবে, আবার কেউ দেখছেন স্রেফ খেই হারিয়ে ফেলা এক সিনেমা হিসেবে। তবে ঘরবন্দি জীবনের যে ভয়ংকর রূপ এই ছবিতে দেখানো হয়েছে, তা দর্শকদের দীর্ঘ সময় ভাবাবে—এ কথা বলাই বাহুল্য।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।