‘নরমাল’ শহর আসলে কতটা নরমাল, রহস্য ফাঁসেই বদলে যায় সব

বরফে ঢাকা শান্ত এক শহর। জনসংখ্যা মাত্র ১ হাজার ৮৯০। অপরাধের ঘটনা প্রায় নেই বললেই চলে। মানুষজন হাসিমুখে কথা বলে, দোকানে স্বাভাবিকভাবেই চলে কেনাকাটা, আর স্থানীয় মেয়রও বেশ বন্ধুবৎসল। এমন জায়গায় নতুন শেরিফের কাজটা খুব কঠিন হওয়ার কথা নয়। কাগজপত্রে সই করা, ছোটখাটো ঝামেলা সামলানো আর ছয় সপ্তাহের দায়িত্ব শেষে অন্য শহরে চলে যাওয়া-উলিসিস রিচার্ডসনের (বব ওডেনকার্ক) পরিকল্পনাটাও ছিল ঠিক এমনই।

কিন্তু শহরের নাম ‘নরমাল’ হলেও বাস্তবে এখানকার কিছুই স্বাভাবিক নয়। বরফে ঢাকা শান্ত পরিবেশের আড়ালে লুকিয়ে আছে লোভ, অস্ত্র, সহিংসতা, দুর্নীতি ও নানা গোপন হিসাব-নিকাশ। আর সেই অস্বাভাবিক জগতের মাঝখানে এসে পড়েন এমন একজন শেরিফ, যিনি নিজের জীবন নিয়েই খুব একটা আশাবাদী নন।

বেন হুইটলির ‘নরমাল’ মূলত অ্যাকশন-কমেডি ঘরানার সিনেমা। তবে এর গল্পের ভেতর দিয়ে ছোট শহরের আমেরিকান জীবনের নানা অসংগতিকেও ব্যঙ্গ করা হয়েছে। ছবির চিত্রনাট্য লিখেছেন বব ওডেনকার্ক ও ডেরেক কোলস্টাড। অ্যাকশন সিনেমার দর্শকদের কাছে কোলস্টাড পরিচিত ‘জন উইক’ ফ্র্যাঞ্চাইজি এবং ওডেনকার্ক অভিনীত ‘নোবডি’ ছবির চিত্রনাট্যকার হিসেবে।

তাই ‘নরমাল’ দেখতে বসলে ‘নোবডি’ কিংবা ‘জন উইক’-এর কিছুটা ছায়া চোখে পড়তেই পারে। তবে এবারের উলিসিস কোনো অবসরপ্রাপ্ত গুপ্তঘাতক কিংবা সাধারণ চেহারার সুপ্ত অ্যাকশন হিরো নন। অন্তত গল্পের শুরুতে তিনি সত্যিই একজন সাধারণ মানুষ।

উলিসিসের নিজের জীবনও খুব একটা স্বাভাবিক নয়। স্ত্রী থেকে আলাদা হয়ে আছেন তিনি। আগের কর্মস্থলে ঘটে যাওয়া একটি সহিংস ঘটনার স্মৃতিও বয়ে বেড়াচ্ছেন। নিজের কাজ ও জীবন সম্পর্কে তাঁর দর্শন বেশ নির্লিপ্ত-‘জীবন অনেক সহজ হয়, যখন আপনি একটু কম চিন্তা করেন।’ নরমাল শহরেও তাঁর লক্ষ্য ছিল খুব পরিষ্কার-যেভাবে শহরটিকে পেয়েছেন, সেভাবেই রেখে দায়িত্ব শেষ করে চলে যাওয়া।

ক্লান্ত, হতাশ এবং মধ্যবয়সী এই মানুষটির চরিত্রই সিনেমার অন্যতম বড় আকর্ষণ। বব ওডেনকার্ক এখানে আবারও তাঁর অভিনয়ের বিশেষ ধরনটি তুলে ধরেছেন। ‘বেটার কল সল’-এর শৌল গুডম্যান কিংবা ‘নোবডি’র হাচ ম্যানসেলের মতো চরিত্রে তাঁর যে অস্বস্তিকর অথচ মজার অসহায়ত্ব দেখা যায়, ‘নরমাল’-এও তার উপস্থিতি রয়েছে। তবে এবার তাঁর শরীরী ভাষায় ক্লান্তি আরও বেশি। তিনি কোনো ঝামেলায় জড়াতে চান না, কিন্তু পরিস্থিতি বারবার তাঁকে অ্যাকশনের কেন্দ্রে ঠেলে দেয়।

গল্পের শুরুতেই অবশ্য বোঝা যায়, নরমাল শহরটি বাইরে থেকে যতটা শান্ত, ভেতরে ততটাই অস্বাভাবিক। সদ্য মারা যাওয়া আগের শেরিফের মৃত্যু রহস্যজনক। তাঁর বাড়িও অস্বাভাবিক রকম বড়। পুলিশ বিভাগের অস্ত্রভান্ডার দেখে মনে হয়, এটি কোনো ছোট শহরের থানার জন্য তৈরি নয়। হার্ডওয়্যার দোকানের তালাবদ্ধ ঘর, পুলিশ স্ক্যানার শুনতে থাকা এক বৃদ্ধা এবং স্থানীয় দোকান-রেস্তোরাঁয় অস্বাভাবিক সংখ্যক বন্দুক-সবকিছু মিলিয়ে উলিসিসের সন্দেহ ক্রমেই বাড়তে থাকে।

এর মধ্যেই শহরের ব্যাংকে ডাকাতি করতে আসে দুই ‘হতভাগ্য অপরাধী’। শুরুতে ঘটনাটি সাধারণ ব্যাংক ডাকাতির মতো মনে হলেও খুব দ্রুত পরিস্থিতি বদলে যায়। একে একে শহরের মানুষ, পুলিশ এবং মেয়র-সবাই যেন উলিসিসের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। শান্ত পরিবেশ মুহূর্তেই বদলে যায় বন্দুকযুদ্ধের ময়দানে।

এখানেই ‘নরমাল’ সবচেয়ে বেশি উপভোগ্য হয়ে ওঠে। পরিচালক বেন হুইটলি এর আগে ‘ফ্রি ফায়ার’ সিনেমায় সীমিত একটি জায়গার মধ্যে বন্দুকযুদ্ধকে ব্ল্যাক কমেডির মজার আবহে তুলে ধরেছিলেন। ‘নরমাল’-এও তাঁর সেই পরিচিত নির্মাণশৈলীর ছাপ রয়েছে। বরফঝড়, পুলিশের গাড়ির আলো, বিস্ফোরণ, গুলির শব্দ আর চারপাশে ছিটকে পড়া মানুষ-সব মিলিয়ে অ্যাকশন দৃশ্যগুলো বেশ জমজমাট।

কখনো রান্নাঘরের হাতিয়ার, কখনো শটগান, আবার কখনো ভারী অস্ত্র-উলিসিসের হাতে যা আসে, সেটিই যেন হয়ে ওঠে লড়াইয়ের অস্ত্র। বব ওডেনকার্কের আপাতনিরীহ চেহারার সঙ্গে ভয়াবহ সহিংসতার এই বৈপরীত্যই সিনেমাটির বড় আকর্ষণ। তাঁর গম্ভীর মুখ, ক্লান্ত শরীরী ভাষা এবং হঠাৎ বিস্ফোরিত সহিংসতা দর্শকের জন্য একই সঙ্গে হাস্যকর ও অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা তৈরি করে।

তবে সিনেমার সহিংসতা শুধু বিনোদনের জন্য ব্যবহার করা হয়নি। ছোট শহরের গল্পের মধ্য দিয়ে আমেরিকার কিছু বাস্তব সামাজিক প্রবণতাকেও ব্যঙ্গ করা হয়েছে। অর্থনৈতিক স্থবিরতা, সামাজিক বিভাজন, অস্ত্রের প্রতি অস্বাভাবিক আসক্তি এবং ‘আমরা বনাম তারা’ ধরনের মানসিকতাকে এখানে অতিরঞ্জিত করে তুলে ধরা হয়েছে।

স্থানীয় বার ও রেস্তোরাঁর দেয়ালে ঝুলছে অসংখ্য বন্দুক। উলিসিস যখন জানতে চান, সেগুলো সব লোড করা কি না, তখন হাসিমুখে উত্তর আসে-লোড করা না থাকলে তো মজাই নেই। এই ধরনের দৃশ্যই ‘নরমাল’-এর কমেডিকে আলাদা করে। নির্মাতা অস্বাভাবিক পরিস্থিতিকে জোর করে হাস্যকর করার চেষ্টা করেননি; বরং চরিত্রগুলোকে সবকিছু স্বাভাবিক ভঙ্গিতে করতে দিয়েছেন। আর সেখান থেকেই তৈরি হয়েছে হাস্যরস।

সিনেমাটি একই সঙ্গে মনে করিয়ে দেয় ‘ফার্গো’র কথাও। তুষারে ঢাকা মিনেসোটা, শান্ত ছোট শহর, অদ্ভুত সব চরিত্র এবং অপরাধের আড়ালে লুকিয়ে থাকা গোপন জগত-সব মিলিয়ে কোয়েন ভ্রাতৃদ্বয়ের সিনেমার সঙ্গে ‘নরমাল’-এর মিল রয়েছে। আগের শেরিফের নাম গন্ডারসন হওয়াটাও সেই মিলকে আরও স্পষ্ট করে। তবে ‘নরমাল’ ‘ফার্গো’র মতো ডার্ক কমেডির পথে পুরোপুরি হাঁটেনি। বরং ‘জন উইক’-এর অতিরঞ্জিত অ্যাকশন ও ‘ফ্রি ফায়ার’-এর উন্মত্ততার দিকে বেশি ঝুঁকেছে।

ছবিতে রাজনৈতিক ইঙ্গিতও রয়েছে। আগের শেরিফের কিশোর সন্তান অ্যালেক্সের (জেস ম্যাকলয়েড) গল্পের মধ্য দিয়ে শহরের মানুষের নিয়ন্ত্রণপ্রবণতা ও সামাজিক বিভাজনের দিকটি সামনে আসে। পাশাপাশি অস্ত্র, আত্মরক্ষা, সামরিক সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক মেরুকরণের মতো বিষয়ও গল্পে উঠে এসেছে। তবে ‘নরমাল’ এসব নিয়ে দীর্ঘ কোনো বক্তৃতায় যায়নি। অনেক সময় গুলির শব্দই এখানে সংলাপের জায়গা দখল করেছে।

তবে সিনেমাটির কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। গল্পে অনেক চরিত্র ও উপকরণ হাজির করা হলেও সবগুলোর যথেষ্ট বিকাশ ঘটেনি। উলিসিসের অতীত, ভেঙে যাওয়া সংসার, আগের চাকরির ট্র্যাজেডি, অ্যালেক্সের গল্প এবং স্থানীয় কিছু চরিত্র-প্রতিটির মধ্যেই সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু মাত্র ৯০ মিনিটের মধ্যে এত কিছু তুলে ধরতে গিয়ে বেশ কিছু বিষয় দ্রুত পার হয়ে যেতে হয়েছে। ফলে কিছু আবেগঘন মুহূর্তও প্রত্যাশিত প্রভাব তৈরি করতে পারেনি।

কমেডির ক্ষেত্রেও একই বিষয় দেখা যায়। কিছু দৃশ্য দারুণ কার্যকর হলেও সব জায়গায় হাস্যরস সমান শক্তিশালী নয়। সিনেমার বেশ কিছু চমকও দর্শক আগে থেকেই অনুমান করতে পারেন। তবে ‘নরমাল’ এমন কোনো সিনেমা নয়, যেখানে রহস্যের সমাধান জানার জন্যই দর্শককে শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

বরং এই সিনেমার মূল আনন্দ হলো-গল্পের চমকগুলোকে কীভাবে রক্তাক্ত, অদ্ভুত এবং একই সঙ্গে হাস্যকর অ্যাকশনে রূপ দেওয়া হচ্ছে। সেখানেই ‘নরমাল’ তার নিজস্ব মেজাজ খুঁজে পায়।

সব মিলিয়ে অ্যাকশন সিনেমা হিসেবে ‘নরমাল’ হয়তো একেবারে নতুন কিছু উপহার দিতে পারেনি। কিন্তু ডার্ক কমেডি, রোমাঞ্চ, অতিরঞ্জিত অ্যাকশন এবং বব ওডেনকার্কের শক্তিশালী অভিনয় একসঙ্গে মিলে ছবিটিকে মোটের ওপর উপভোগ্য করে তুলেছে। শান্ত ও স্বাভাবিক একটি শহরের মুখোশ খুলে ভেতরের অস্বাভাবিক জগতকে দেখানোর চেষ্টাই শেষ পর্যন্ত ‘নরমাল’-এর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।

ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।