বাংলাদেশের আধুনিক পপ ও মেলোডি গানের অন্যতম জনপ্রিয় কণ্ঠ ও সংগীত পরিচালক আরফিন রুমি দীর্ঘদিনের নীরবতা ভেঙে আবারও নিজের চেনা ছন্দে ফিরে এসেছেন। সম্প্রতি নাট্যনির্মাতা মোস্তফা কামাল রাজের জনপ্রিয় ধারাবাহিক নাটক ‘এটা আমাদেরই গল্প’ গত মে মাসে শেষ হলেও নাটকটির টাইটেল ট্র্যাক গেয়ে নতুন করে সংগীতাঙ্গনের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন তিনি। প্রকাশের পরপরই গানটি যেমন সাধারণ শ্রোতাদের হৃদয় ছুঁয়েছে, তেমনি সমসাময়িক ও অনুজ প্রজন্মের শিল্পীদের পরিবারের অন্দরমহলেও পছন্দের শীর্ষে জায়গা করে নিয়েছে। সহকর্মী ও ভক্তদের এমন অভাবনীয় ইতিবাচক সাড়ায় নতুন করে সুরের ভুবনে নিজেকে সমর্পণের প্রবল অনুপ্রেরণা খুঁজে পেয়েছেন এই তারকা শিল্পী।
শুধু মাইক্রোফোনের সামনে কণ্ঠ দেওয়াই নয়, বরং সুর ও সংগীত পরিচালনার পাশাপাশি পূর্ণাঙ্গ আবহসংগীত (ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর) নির্মাণেও সমান সক্রিয় হয়েছেন রুমি। পরিচালক মোস্তফা কামালের নতুন ধারাবাহিক নাটক ‘ফিরে আসার গল্প’-এর জন্য সম্প্রতি টাইটেল গান গাওয়ার পাশাপাশি পুরো প্রজেক্টের আবহসংগীতের কাজ করছেন তিনি। নাটকটির নামের মতোই কাকতালীয়ভাবে মিলে গেছে আরফিন রুমির বাস্তব জীবনের বর্তমান অধ্যায়—যা এক অনুপ্রেরণাদায়ী ‘ফিরে আসার গল্প’।
অথচ ক্যারিয়ারের এই সোনালি অধ্যায়ের পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ ও কণ্টকাকীর্ণ পথ। ২০০৫ সালে বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেলে কণ্ঠ দেওয়ার মধ্য দিয়ে অডিও ইন্ডাস্ট্রিতে পা রেখেছিলেন রুমি। এরপর নিজস্ব গায়কী ও আধুনিক মেলোডির সমন্বয়ে একের পর এক সুপারহিট গান উপহার দিয়ে খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছান তিনি। কিন্তু ক্যারিয়ারের সেই মধ্যাহ্নেই হঠাৎ নেমে আসে ছন্দপতন। পারিবারিক জীবনের টানাপোড়েন এবং একাধিক আইনি জটিলতার মতো সংবেদনশীল ঘটনায় জড়িয়ে বারবার গণমাধ্যমের শিরোনাম হতে হয় তাঁকে। ফলে ক্রমশ তাঁর নিয়মিত সংগীতচর্চায় ভাটা পড়ে এবং ব্যস্ততা উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়।
তবে সংগীতের মূল স্রোত থেকে এই দীর্ঘ অনুপস্থিতিকে কখনোই নেতিবাচকভাবে দেখতে নারাজ রুমি। তাঁর মতে, একজন প্রকৃত শিল্পীকে যে সবসময় দৃশ্যপটে থাকতেই হবে, বিষয়টি এমন নয়। নিজের এই ভাবনাকে স্পষ্ট করতে দেশের শীর্ষ নায়ক শাকিব খানের ক্যারিয়ারের উদাহরণ টেনে রুমি বলেন, "কাজের ব্যস্ততায় মাঝে একটু ডুব দিতে হয়। যাতে বিরতির পর আবার নতুন করে শুরু করা যায়। আমার সেই অনিয়মিত থাকাটা একরকম নতুন উদ্যমে ফেরার প্রস্তুতিও বলা যেতে পারে।" তিনি আরও জানান, জীবনের এই অনাকাঙ্ক্ষিত বিরতি তাঁর ভেতরের মানুষকে বদলে দিয়েছে। আগের মতো কোনো কিছু মনের মতো না হলে এখন আর তিনি ভেঙে পড়েন না, বরং বাস্তবতা শান্তভাবে গ্রহণ করতে শিখেছেন। জীবনের নানা অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ হয়ে সংগীতকেও এখন অনেক বেশি গভীর ও পরিণত দৃষ্টিতে দেখছেন তিনি।
নিজেকে নতুন করে সাজিয়ে এবার স্টুডিওতে তুমুল ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন রুমি। বর্তমানে তাঁর ডজনখানেক নতুন একক ও দ্বৈত গানের রেকর্ডিংয়ের কাজ জোরকদমে চলছে। একই সঙ্গে প্রায় ৩০টি গানের মিউজিক ভিডিও প্রজেক্টের নির্মাণকাজ চলমান, যার কয়েকটি ইতোমধ্যে বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত হয়ে প্রশংসিত হয়েছে। একসঙ্গে এত গানের সমাহার অবশ্য রুমির ক্যারিয়ারে কোনো নতুন ঘটনা নয়। অতীতের স্মৃতি তুলে ধরে তিনি বলেন, "আমি আগে নিয়মিতই মাসে পাঁচ-ছয়টি করে গান মুক্তি দিতাম। ২০১৯ সালে তো এমনও হয়েছে, টানা ২৮ দিনে ২৮টা গান তৈরি করে ইউটিউবে মুক্তি দিয়েছি। আমি তো শিল্পী, কেউ যদি জানতে চায়, আমি কী বলব! তাই এভাবেই কাজ করেছি।"
স্টুডিও রেকর্ডিংয়ের পাশাপাশি লাইভ পারফরম্যান্সের মঞ্চেও সরব হয়ে উঠেছেন তিনি। নিয়মিত স্টেজ শোর ব্যস্ততা বাড়ছে এবং আগামী অক্টোবর মাস থেকে এই ব্যস্ততার পরিধি আরও বিস্তৃত হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। বিশেষ করে টিকিট কেটে আসা কনসার্টগুলোতে তরুণ প্রজন্মের উপচে পড়া ভিড় তাঁকে নতুন করে আলোড়িত করেছে। দর্শকদের সঙ্গে এই মেলবন্ধন প্রসঙ্গে রুমি বলেন, "শ্রোতার পালস তো আমার বোঝা। মঞ্চে যখন গাইতে যাই, তা টের পাই। কয়েকটি টিকিট শো করেছি। তরুণ-তরুণীরা ছিল। সবাই গানের সঙ্গে একাত্ম হয়ে দারুণ মজা করেছে। এসব আমাকে অনেক বেশি উদ্দীপ্ত করেছে, শ্রোতাদের প্রতি আরও দায়বদ্ধ হতে শেখাচ্ছে।"
আজকের সংগীততারকা আরফিন রুমির জীবনের শুরুটা কিন্তু সুর দিয়ে হয়নি; শৈশবে তিনি একজন পেশাদার ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন এবং নিয়মিত ক্রিকেট খেলতেন। পরবর্তীতে মায়ের ঐকান্তিক উৎসাহ ও অনুপ্রেরণাতেই গানের ভুবনে তাঁর প্রবেশ ঘটে। হারমোনিয়ামের রিডে সুর তোলার দিনগুলো থেকেই সংগীতের মায়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন তিনি। ২০০৫ সালে বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেল দিয়ে যাত্রা শুরুর পর ২০০৭ সালে বাজারে আসে তাঁর জীবনের প্রথম একক অডিও অ্যালবাম। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি; অডিও ইন্ডাস্ট্রি থেকে চলচ্চিত্রের প্লেব্যাক—সব মাধ্যমেই তিনি একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করেন।
ক্যারিয়ারের প্রারম্ভে দেশের অন্যতম শীর্ষ সুরকার হাবিব ওয়াহিদের সান্নিধ্যে কাজ শেখার সুযোগ পান তিনি এবং হাবিবের মাধ্যমেই প্রখ্যাত সুরকার ফুয়াদ আল মুক্তাদিরের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ও সংগীতচর্চা আরও সমৃদ্ধ হয়। পরবর্তীতে নিজের গান গাওয়ার পাশাপাশি সুরকার ও সংগীত পরিচালক হিসেবে ইন্ডাস্ট্রিতে এক অনন্য ব্র্যান্ড তৈরি করেন রুমি, যার মূল চালিকাশক্তি হয়ে দাঁড়ায় মনছোঁয়া মেলোডি।
শ্রোতাদের মুখে মুখে ফেরা ‘বলো না কোথায় তুমি’, ‘সহেনা যাতনা’, ‘জ্বলে ওঠো বাংলাদেশ’, ‘প্রিয়তমা’, ‘হৃদয়ে আমার বাংলাদেশ’, ‘চিঠি’, ‘তোমারই পরশে’, ‘খুঁজে খুঁজে’, ‘তুই আর আমি’ কিংবা ‘তুমি আমার’-এর মতো কালজয়ী গানগুলো আরফিন রুমিকে সংগীতাঙ্গনে স্থায়ী আসন এনে দিয়েছে। কেবল নিজের কণ্ঠেই নয়, তাঁর সুর ও সংগীতে ফিচারিং করা ‘এক জীবন’, ‘সোনা বউ’ কিংবা ‘এর বেশি ভালোবাসা যায় না’ গানগুলোও পেয়েছে আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা। রোমান্টিক, দেশাত্মবোধক কিংবা ফাস্ট বিটের রিদমিক গান—সব ধরনের ঘরানায় নিজের বহুমুখী প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে আরফিন রুমি এখন প্রস্তুত তাঁর ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় ইনিংসকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।